জামালপুরের মাদারগঞ্জে মাত্র ৫০০ টাকার বাজি ধরে একটি জীবন্ত পাখিকে নির্মমভাবে ছিঁড়ে খাওয়ার ঘটনা শুধু প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত নয়, আমাদের সামাজিক বিবেকেরও এক ভয়াবহ পরীক্ষা। একটি পাখিকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আর সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ উল্লাস করেছে, কেউ ভিডিও করেছে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো, সেখানে বাধা দেওয়ার মতো একজন মানুষও কি ছিলেন না?
ঘটনাটি ঘটেছে ১৩ অক্টোবর বিকেলে উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের কোয়ালিকান্দি বাজারে। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্য এক অটোচালকের সঙ্গে ৫০০ টাকার বাজি ধরে ছাদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে একটি জীবন্ত পাখির পা ও ডানা মুচড়ে ভেঙে ফেলেন। এরপর পাখিটিকে জীবন্ত ছিঁড়ে খান তিনি। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক নিন্দা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু গ্রেপ্তারই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ করে দেয়? এই ঘটনা যে সামাজিক মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তা কি এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে?
একটি অসহায় প্রাণীর ওপর নির্যাতন চলছিল প্রকাশ্যে। সেখানে উপস্থিত মানুষেরা কী দেখছিলেন? তাঁরা কি কেবল একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখছিলেন, নাকি নিজেদের বিনোদনের জন্য একটি প্রাণীর যন্ত্রণাকে উপভোগ করছিলেন? কেউ যদি ভিডিও ধারণ করে থাকেন, তবে তাঁর কাছে দৃশ্যটি ধারণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। অথচ সেই মুহূর্তে প্রাণীটিকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসা কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল না?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কেউ হয়তো ভয়ে বাধা দেননি, কেউ হয়তো ভেবেছেন, অন্য কেউ এগিয়ে আসবেন। আবার কেউ ঘটনাটিকে নিছক তামাশা হিসেবেও দেখতে পারেন। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, একটি নিষ্ঠুর ঘটনা ঠেকানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সবাই দর্শক হয়ে থাকলে নিষ্ঠুরতা শুধু একজনের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। নীরবতা তখন সেই নিষ্ঠুরতার পথ সহজ করে দেয়।
আমাদের সমাজে এখন যেকোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও ধারণ করার প্রবণতা দেখা যায়। দুর্ঘটনায় আহত মানুষ, বিপদে পড়া অসহায় ব্যক্তি কিংবা নির্যাতনের শিকার কারও পাশে দাঁড়ানোর আগে অনেকের হাত চলে যায় ক্যামেরার দিকে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সমালোচনা হয়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু যে মুহূর্তে সাহায্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই মুহূর্তটি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
প্রযুক্তি আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীকে আরও দৃশ্যমান করেছে, কিন্তু আমাদের বিবেককে কি একইভাবে জাগ্রত করেছে? একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। অথচ ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ হয়তো সেই নিষ্ঠুরতাটি ঘটতেই দিত না। এই ব্যবধানই আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
এখানে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই চলবে না। যিনি বাজি ধরেছেন, যাঁরা ঘটনাটি উপভোগ করেছেন, যাঁরা উল্লাস করেছেন এবং যাঁরা বাধা দেওয়ার সুযোগ পেয়েও নীরব থেকেছেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও সামাজিকভাবে ভাবতে হবে। অবশ্য প্রত্যেক দর্শককে সমানভাবে দায়ী করা যায় না; কারও পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করা ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। কিন্তু নিরাপদ উপায়ে প্রতিবাদ করা, অন্যদের সহায়তা চাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়ার সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগানো জরুরি।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা এবং জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার চর্চা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনায় আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে নিষ্ঠুরতাকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ না করা।

