বিবিসি: ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনকারীরা যখন রাজধানী নয়াদিল্লিতে আবারও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ২৯ বছর বয়সী এক পিএইচডি গবেষক। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা।
নেহা একজন নাট্যকর্মী ও রাজনৈতিক অধিকারকর্মী। গত এক দশক ধরে তিনি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সঙ্গে যুক্ত। গত দুই বছর ধরে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিচিতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজপথেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্য নেহাকে রাস্তায় টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও তাঁকে পুলিশের ব্যারিকেডের ওপর উঠে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগান দিতে দেখা গেছে, কোথাও আবার তাঁকে আটক করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তাঁর হাসিমুখের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নেহা অবশ্য তাঁকে ঘিরে বাড়তি আলোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঘটনাগুলো ক্যামেরার সামনে ঘটেছে বলেই হয়তো সেগুলোকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের তিনি দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের প্রতিবাদ করতে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ক্যামেরা তাঁর দিকে ছিল বলেই মানুষ মনে করছে, বিশেষ কিছু ঘটছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনামলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোকে অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন স্থানে একাধিক আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন, যা পরে রাজপথের প্রতিবাদে রূপ নেয়।
গত গ্রীষ্মে শিক্ষা সংস্কারের প্রতিবাদে সিজেপির নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলে। জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ওই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। পাশাপাশি নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে কংগ্রেসসহ ভারতের বিরোধী দলগুলোও রাজপথে সক্রিয় হয়েছে। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি ও আটকের ভিডিও আলোচনায় এসেছে।
আগামী ১০ অক্টোবর নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরে সিজেপির ডাকা বিক্ষোভের অন্যতম দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। অভিযোগ, ভোটার তালিকায় কারসাজি করে মোদির দল বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়েই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নেহা সিজেপির সদস্য না হলেও তাঁর সংগঠন আইসা এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে জন্ম নেহার। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় শৈশবে তাঁকে বিভিন্ন শহরে থাকতে হয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে রাজধানীর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। বর্তমানে ভারতের অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে শিক্ষা সংস্কারবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম ব্যাপক পরিচিতি পান নেহা। আন্দোলনের শুরু থেকেই আইসা ও নেহা এতে যুক্ত থাকলেও তখন তাঁদের খুব বেশি মানুষ চিনতেন না। ২৮ জুন শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে অনশন শুরু করলে নেহা ও আইসার কয়েকজন কর্মীও তাঁর সঙ্গে অনশনে যোগ দেন।
পরে এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেছিলেন, এই আন্দোলনে যুক্ত হওয়া তাঁদের কাছে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবাদ করে আসছেন।
আন্দোলনে ওয়াংচুকের উপস্থিতি ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করলেও নেহার স্পষ্ট বক্তব্য ও প্রতিবাদী বক্তৃতাও ধীরে ধীরে তাঁকে পরিচিত করে তোলে। ওয়াংচুকসহ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পরও নেহা অনশন চালিয়ে যান। এতে তাঁর ওজন আট কেজি কমে যায়।
হাসপাতালে নেওয়ার পরও এক ভিডিও বার্তায় তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানান। নেহা বলেন, সুস্থ হয়ে আবার রাজপথে ফিরবেন এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াই অব্যাহত রাখবেন।
জুলাইয়ে আন্দোলন শেষ হওয়ার পর নেহা তরুণদের আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। সিজেপি ও সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন তিনি।
তবে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপি নেতাদের সমালোচনা করায় পারিবারিক বিরোধের মুখেও পড়েছেন নেহা। বিবিসি বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা-মা বিজেপির কট্টর সমর্থক হওয়ায় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁদের সঙ্গে প্রায়ই মতবিরোধ হয়।
গত মাসে উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে নিয়ে কথিত আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে নেহার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি পুলিশি অভিযোগ দায়ের করে বিজেপি। এর দুই দিন আগে নেহাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এফআইআর দায়েরের দাবি জানিয়েছিল আইসা।
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিতে ভারতের একাধিক শহরে ঘুরে বেড়ানো নেহা ঝাড়খণ্ডেও আলোচনায় আসেন। সেখানে একটি প্রতিবাদ মিছিলে এক ব্যক্তি তাঁর মুখে কালি ছুড়ে মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে নেহা ইনস্টাগ্রামে কালি লেগে থাকা মুখের ছবি প্রকাশ করেন। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
বারবার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ঘটনায় নেহা এখন রাজপথের লড়াকু কর্মী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ভারতের রাজনীতির গতিপথ বরাবরই রাজপথের আন্দোলন নির্ধারণ করেছে। আগামী কয়েক বছরেও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সামাজিক পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো শুধু সংসদে বসে থাকা রাজনীতিকদের কারণে ঘটেনি, বরং রাজপথের আন্দোলন থেকেই এসেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভকে সামনে রেখে নেহা ও আইসা আবারও সিজেপির সঙ্গে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, লক্ষ্য গণতন্ত্র রক্ষা করা।




