ওয়েনরাং জিয়াং ।। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরে ছিল রাষ্ট্রীয় সফরের চেনা সব আয়োজন। বি-২ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন, পান্ডা, এমনকি নিক্সন আমলের ঐতিহাসিক টোস্টও ছিল সেখানে। কিন্তু বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর দৃষ্টিতে এসব আনুষ্ঠানিকতা ছিল মূল বিষয় নয়। তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ককে ঘিরে চীনের ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র ওপর জোর দেওয়া।
রিয়াদ থেকে নয়াদিল্লি, জাকার্তা থেকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, এসব দেশের জন্য বৈঠকটি আগামী দশকের বাকি সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছে।
বৈঠক শেষে বেইজিং এমন এক কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পেরেছে, যেখানে তারা কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়েও কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বৈঠকে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানকে ঘিরে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে তারা সরাসরি জড়িত। একই সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে মিত্রদের ওপর চাপ, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান বেছে নেওয়ার চাপও রয়েছে।
এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, তাকে নিয়ে টোস্ট করেছেন এবং বৈঠককে সফল বলে অভিহিত করেছেন। চীনের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে যেসব দেশকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তাদের কাছে এই বৈপরীত্য নিশ্চয়ই নজর এড়াবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত সুবিধা
এই পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনকে দিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সহায়তা নিতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে আছে।
সি চিন পিং যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে চীনের সরকারি বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে পুনরায় খুলবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেয়নি বেইজিং। এর মধ্য দিয়ে চীন সম্ভবত নিজের কূটনৈতিক বিকল্পগুলো খোলা রাখতে চাইছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলোর জন্য এই অবস্থানের আলাদা সুবিধা রয়েছে। চীন তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, জাতিসংঘে বিবৃতি দিতে পারে কিংবা মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিতে পারে, অথচ এর জন্য কোনো সেনা পাঠানো বা সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রয়োজন হয় না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধের একটি পক্ষ। ফলে যে সংকট তৈরিতে ওয়াশিংটনের নিজেরও ভূমিকা রয়েছে, সেই সংকটের মধ্যেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো তাই ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করছে। নিরাপত্তা ও সামরিক সরঞ্জামের জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকছে, আবার কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্কও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ চীনের একটি বড় সুবিধা হলো, ওয়াশিংটনের মতো সে নিজে এসব যুদ্ধে সরাসরি লড়ছে না।
এই হিসাব মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত অঞ্চলেও প্রযোজ্য। ইরাক, মিসর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নৌপথে সংকটের প্রভাব দেখছে। তাদের কাছে চীনের সামরিক সংযম আকর্ষণীয় হতে পারে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নতুন কোনো পরাশক্তিকে যুদ্ধে জড়াতে দেখতে চায় না। তাদের প্রয়োজন এমন একজন অংশীদার, যে গুলি না চালিয়েও সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। চীন নিজেকে সেই ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা ও ভারসাম্যের রাজনীতি
বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যান্য দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে তাদের চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেই বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসছেন। তাদের ওপর শুল্কের চাপ ও সরবরাহব্যবস্থার ধাক্কা সামলানোর দায়িত্ব পড়ছে, অথচ ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের বাণিজ্যিক বিরোধে আবারও সাময়িক সমঝোতা বাড়িয়ে নিচ্ছে।
ফলে অনেক দেশের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার খরচ অন্য দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনমতো সমঝোতা করার স্বাধীনতা ধরে রাখছে।
এর প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। ভারত একদিকে বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে, রাশিয়া থেকে তেল কিনছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে এবং চীনা বিনিয়োগের সুযোগও রাখছে। ইন্দোনেশিয়া তার ‘স্বাধীন ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের সঙ্গেই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলও ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে নিজেদের কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে। এর অর্থ সরাসরি পশ্চিমবিরোধিতা নয়; বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা তৈরি করা, যেখানে নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অন্যদের হাতে।
ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের বৈঠক এই ভারসাম্যনীতির সূচনা করেনি। তবে বৈঠকটি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিয়ম তৈরির প্রশ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক দক্ষিণের সামনে ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের নিয়মগুলো আসলে কে তৈরি করবে?
সি চিন পিং ‘মানব নিয়ন্ত্রণের’ ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প নতুন ধরনের এআই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে অনাগ্রহী অবস্থান নিয়েছেন। এটি দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হলেও, কোনোটিই মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি।
দুই দেশ নতুন করে এআই নিয়ে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। সম্ভাব্য এআই-সংক্রান্ত ঘটনার বিষয়ে পরস্পরকে জানানোর একটি ব্যবস্থাও আলোচনায় রয়েছে। তবে এখনো কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরি হয়নি।
এর ফলে বহু দেশ এমন প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে, যেগুলো তাদের দেশের বাইরে তৈরি হচ্ছে। অথচ সেসব প্রযুক্তি পরিচালনার নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে তাদের ভূমিকা সীমিত থাকবে।
চীনের রাষ্ট্রনির্ভর মডেল যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেটনির্ভর মডেলের তুলনায় কারও কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সেটিও এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে।
তবে বৈশ্বিক দক্ষিণ পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। ভারত নিজস্ব বৃহৎ ভাষা মডেল তৈরির চেষ্টা করছে এবং তার ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামোর অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ এআই কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে। আফ্রিকান ইউনিয়নও তথ্যের সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দিয়ে এমন কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
এসব উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে এগুলো দেখাচ্ছে, অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মডেলের মধ্যে একটি বেছে নিতে চায় না।
চীনও নিজস্ব ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা ‘গ্লোবাল এআই গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে এবং ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। জুলাইয়ে সাংহাইয়ে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে ২৯টি দেশ স্বাক্ষর করে।
কারও কাছে এটি পশ্চিমা কাঠামোর বিকল্প হিসেবে আকর্ষণীয় হতে পারে। আবার অন্যদের কাছে এটি এক ধরনের নির্ভরশীলতার বদলে আরেক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি করার আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় করতে পারবে কি না, যাতে এআইসহ ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো তারা নিজেরাও প্রভাবিত করতে পারে।
বৈঠকের পর যে বার্তা
আনুষ্ঠানিকতা ও ছবির বাইরে ট্রাম্প-সি বৈঠক থেকে যে বৃহত্তর বার্তাটি পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো ওয়াশিংটন পেয়েছে প্রতীকী সাফল্য ও সাময়িক শুল্ক-সমঝোতা, আর বেইজিং পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের কাঙ্ক্ষিত কাঠামো নিয়ে আলোচনার সুযোগ।
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এই বৈঠক এমন একটি কৌশলকে আরও স্পষ্ট করেছে, যা তারা ইতোমধ্যে অনুসরণ করছে। যেখানে সম্ভব, কোনো একটি পক্ষ বেছে না নিয়ে উভয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের প্রতিযোগিতাকে নিজেদের স্বার্থ ও দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা।
বেইজিংয়ের শর্তে পরিচালিত বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শান্তি নয়। তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার এই ব্যবধান রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের জন্য নিজেদের প্রভাব ও কৌশলগত পরিসর বাড়ানোর কিছু সুযোগও তৈরি করতে পারে।
চ্যালেঞ্জ হলো, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেসব সমঝোতা হবে, সেগুলোর খরচ যেন অন্য দেশগুলোকে একতরফাভাবে বহন করতে না হয়। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সামনে এখন মূল প্রশ্ন, তারা বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সেই প্রতিযোগিতার মধ্যেই কার্যকর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারবে।- আল জাজিরা থেকে বাংলায় রুপান্তরিত




