আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন লেখক ফিরদৌস সৈয়দ। তাঁর মতে, দেশটিতে মুসলমানদের জনসংখ্যাগত অস্তিত্ব মুছে ফেলা সম্ভব না হলেও তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দুর্বল করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
একটি নিবন্ধে ফিরদৌস সৈয়দ বলেন, ‘মুসলিম’ বলতে একটি জনতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে বোঝায়। আর ‘মুসলিমত্ব’ বলতে বোঝায় ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, কবিতা, সংগীত, শিল্পকলা, স্থাপত্য, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য। তাঁর দাবি, ভারতের ইতিহাস ও সমাজ গঠনে এসব উপাদানের দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে।
নিবন্ধে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কার্যক্রমের প্রসঙ্গ তুলে ধরে লেখক বলেন, মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অদৃশ্য এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বহীন করে তোলার একটি প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের গত ২৯ আগস্ট নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যেরও উল্লেখ করেন। ভাগবত বলেছিলেন, কোনো হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে কোনো মুসলিম থাকা উচিত নয়, তাহলে তিনি আর হিন্দু থাকবেন না। তাঁর মতে, একজন হিন্দুকে বিশ্বাস করতে হবে—সব পথ একই লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা রয়েছে।
তবে ফিরদৌস সৈয়দ তাঁর নিবন্ধে দাবি করেন, এ বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার মিল নেই। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বেশি মুসলমান হলেও ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় মুসলিম সদস্য ২৪ জন, যা ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তাঁর দাবি, ক্ষমতাসীন এনডিএতে কোনো মুসলিম লোকসভা সদস্য নেই এবং ২০২২ সাল থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায়ও কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মুসলিম সদস্যের সংখ্যা ২০১৩ সালের ৩৩৯ থেকে বর্তমানে ২৫৫ জনে নেমেছে। রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি পদেও বর্তমানে কোনো মুসলিম নেই। অতীতে অবশ্য এসব পদে মুসলমানরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার প্রসঙ্গে লেখক ২০০৬ সালের সাচার কমিটির প্রতিবেদন উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ মুসলমান হলেও উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক সেবায় তাদের অংশগ্রহণ ছিল ৩ শতাংশ, পুলিশের জ্যেষ্ঠ পদে ৪ শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
নিবন্ধে উর্দু ভাষার অবস্থারও উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। লেখকের মতে, দেশভাগের পর উর্দু ক্রমেই মুসলমান ও পাকিস্তানের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভারতের জনজীবনে উর্দু লিপির ব্যবহার কমেছে। তবে কবিতা, চলচ্চিত্র ও জনপ্রিয় সংগীতে ভাষাটির ব্যবহার এখনো রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের মুসলিম ইতিহাস নিয়েও লেখক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে দিল্লি সালতানাত ও মোগল আমলের বিষয়বস্তু কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ ইতিহাসকে ‘আক্রমণকারী’ ও ‘বহিরাগত’-এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতকে যে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই সমৃদ্ধির বড় একটি অংশ সালতানাত ও মোগল আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ওই সময়ের ইতিহাসকে ভারতের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রবণতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
নিবন্ধে আহমেদাবাদের একটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের ‘আই অ্যাম মালালা’ এবং অ্যান ফ্রাঙ্কের ‘দ্য ডায়েরি অব অ্যা ইয়াং গার্ল’ বই পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে একটি স্কুল কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিকদের উদ্যোগে বই দুটি নিয়ে গণপাঠের আয়োজন করা হলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা তাতে বাধা দেন বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিরদৌস সৈয়দের মতে, মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে প্রান্তিক করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর নিবন্ধে ভারতের বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস, দর্শন ও সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
মুছে ফেলা হচ্ছে মুসলিম ভারতের সব চিহ্ন
Oplus_131072
React:




