Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
ইতিহাস

আল-আন্দালুস: যে মুসলিম সভ্যতা অন্ধকার ইউরোপে জ্বালিয়েছিল জ্ঞানের প্রদীপ

আল-আন্দালুস: যে মুসলিম সভ্যতা অন্ধকার ইউরোপে জ্বালিয়েছিল জ্ঞানের প্রদীপ

আব্দুর রহিম খান:

পৃথিবীর মানচিত্রে স্পেন আজ সৌন্দর্য, শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নাম। বার্সেলোনার প্রাণচাঞ্চল্য, মাদ্রিদের ঐতিহ্য, গ্রানাডার আলহাম্বরার অপার্থিব সৌন্দর্য কিংবা কর্ডোভার মহিমান্বিত মসজিদ যুগে যুগে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছে।

কিন্তু এই সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর ইতিহাস। এমন এক ইতিহাস, যা অনেকেই জানেন না কিংবা জানতে চান না। সেই ইতিহাস হলো মুসলিম স্পেনের, আল-আন্দালুসের। যে সভ্যতা শুধু একটি ভূখণ্ড শাসন করেনি, বরং অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিকতার নতুন আলো দেখিয়েছিল।

৭১১ খ্রিস্টাব্দ। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ।

উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে আইবেরীয় উপদ্বীপে অবতরণ করেন। সামনে ছিল ভিসিগথ রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনী। সংখ্যার বিচারে মুসলিম বাহিনী ছিল অনেক ছোট, কিন্তু ঈমান, সাহস ও কৌশলে তারা ছিল অপ্রতিরোধ্য।

গুয়াদালেতে সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধে রডারিকের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে স্পেনে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। যে পাহাড়ে তারিক প্রথম অবতরণ করেছিলেন, আজও সেটি “জাবাল আত-তারিক” বা “জিব্রাল্টার” নামে পৃথিবীর মানচিত্রে অমর হয়ে আছে।

এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। স্পেন পরিচিত হয় আল-আন্দালুস নামে। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই এটি পৃথিবীর অন্যতম উন্নত, সমৃদ্ধ ও জ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

যখন ইউরোপের অধিকাংশ শহর ছিল অন্ধকার, অপরিচ্ছন্ন ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, তখন কর্ডোভার রাস্তায় রাতের আঁধার ভেদ করে জ্বলছিল প্রদীপ। সেখানে ছিল পাকা রাস্তা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, সুপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিচ্ছন্ন জনপদ। সেই সময় ইউরোপের বহু রাজাও এমন নগরসভ্যতার কল্পনা করতে পারেননি।

কর্ডোভা ছিল শুধু একটি রাজধানী নয়, ছিল জ্ঞানের রাজধানী।

এখানে ছিল শত শত বিদ্যালয়, বিশাল গ্রন্থাগার, গবেষণাকেন্দ্র এবং উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। খলিফা আল-হাকাম দ্বিতীয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল কয়েক লক্ষ পাণ্ডুলিপি। তখন ইউরোপের অনেক রাজপ্রাসাদেও এত বই ছিল না।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন ও ভাষাবিজ্ঞান শিখতে ছুটে আসতেন আল-আন্দালুসে।

মুসলিম পণ্ডিতরা শুধু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেননি, তাঁরা গ্রিক, রোমান ও প্রাচ্যের বহু অমূল্য জ্ঞান সংরক্ষণ করে আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। পরে সেসব গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কৃষিক্ষেত্রেও মুসলিমরা ঘটিয়েছিলেন এক নীরব বিপ্লব। উন্নত সেচব্যবস্থা, খাল, জলচক্র এবং নতুন কৃষিপদ্ধতির মাধ্যমে মরুভূমির মতো অঞ্চলও হয়ে ওঠে সবুজ শস্যভূমি। ধান, আখ, তুলা, কমলা, লেবু, ডালিম, জলপাইসহ অসংখ্য ফসলের চাষ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র স্পেনে।

শিল্প ও প্রযুক্তিতেও মুসলিমদের অবদান ছিল অসাধারণ। কাগজ তৈরির প্রযুক্তি ইউরোপে বিস্তার লাভ করে মুসলিমদের হাত ধরেই। ফলে বই লেখা, জ্ঞান সংরক্ষণ এবং শিক্ষার প্রসার বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম চিকিৎসকদের গবেষণা ইউরোপের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। হাসপাতাল, ওষুধ প্রস্তুত, অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসাব্যবস্থায় তাঁদের অবদান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনুসৃত হয়েছে।

আর স্থাপত্য?

গ্রানাডার আলহাম্বরা, কর্ডোভার গ্র্যান্ড মসজিদ, সেভিলের গিরালদা টাওয়ার আজও পৃথিবীর বিস্ময়। দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকাজ, আরবি ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা, জলাধার, উদ্যান ও নান্দনিক নির্মাণশৈলী প্রমাণ করে, মুসলিম স্থপতিরা শুধু ভবন নির্মাণ করেননি, তাঁরা ইতিহাস নির্মাণ করেছিলেন।

আল-আন্দালুস ছিল সহাবস্থানেরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিতরা বহু ক্ষেত্রে একসঙ্গে গবেষণা করেছেন, জ্ঞান বিনিময় করেছেন এবং মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ আল-আন্দালুসকে মধ্যযুগের “জ্ঞানসভ্যতার রাজধানী” বলে অভিহিত করেন।

কিন্তু কোনো সভ্যতাই চিরস্থায়ী নয়।

দীর্ঘ আট শতকের গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটে ১৪৯২ সালে। গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি হয়। এরপর শুরু হয় নির্যাতন, নির্বাসন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং অসংখ্য গ্রন্থ ও ঐতিহ্য ধ্বংসের করুণ ইতিহাস।

তবুও ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায়নি।

আজও স্পেনের ভাষায় হাজার হাজার আরবি শব্দ বেঁচে আছে। আজও কর্ডোভার মসজিদ, আলহাম্বরার দেয়াল, সেভিলের মিনার আর আন্দালুসিয়ার বাতাস সাক্ষ্য দেয়, একদিন এখানে এমন একটি সভ্যতা ছিল, যে সভ্যতা জ্ঞানের আলো দিয়ে অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করেছিল।

আল-আন্দালুস আমাদের শেখায়, একটি জাতির প্রকৃত মহত্ত্ব অস্ত্রের ঝনঝনানিতে নয়, জ্ঞানের দীপ্তিতে; ক্ষমতার অহংকারে নয়, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণে।

সভ্যতা টিকে থাকে প্রাসাদের উচ্চতায় নয়, মানুষের প্রজ্ঞায়। আর সেই কারণেই মুসলিম স্পেন আজও ইতিহাসের পাতায় নয়, মানবসভ্যতার বিবেকেও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলছে।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies