বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। পশ্চিম আকাশে দিনের শেষ আলোটুকু ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। বকুলগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসছে নরম অন্ধকার। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সদ্য ঝরে পড়া বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধ। কোথাও সাইকেলের ঘণ্টা, কোথাও রিকশার টুংটাং শব্দ। তার মাঝেই ধীরে ধীরে জমে উঠছে কয়েকটি পরিচিত মুখ। একজনের হাতে কবিতার খাতা। আরেকজনের কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ, ভেতরে হয়তো নাটকের পাণ্ডুলিপি। একটু দূরে দু-তিনজন তরুণ নিজেদের মধ্যে তর্ক করছেন একটি কবিতা নিয়ে। কেউ হঠাৎ গুনগুন করে গান ধরেছেন। পাশের আড্ডা থেকে ভেসে আসছে হাসির শব্দ। কিছুক্ষণ পর হয়তো শুরু হবে আবৃত্তি; অথবা কোনো নতুন নাটক মঞ্চায়নের পরিকল্পনা নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে আলোচনা।
এটাই ছিল জামালপুরের বকুলতলা।
একসময় সন্ধ্যা নামলেই এই জায়গাটি যেন বদলে যেত। দিনের ব্যস্ত শহর পেছনে ফেলে বকুলতলা হয়ে উঠত সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনানুষ্ঠানিক আসর। এখানে কোনো বিশাল মঞ্চ ছিল না, ছিল না ঝলমলে আলোকসজ্জা। ছিল শতবর্ষী বকুলগাছের তলায় একটি পরিচিত পরিসর, কিছু সৃষ্টিশীল মানুষ এবং সংস্কৃতিকে ঘিরে অদম্য ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই বকুলতলাকে পরিণত করেছিল জামালপুরের সাংস্কৃতিক জীবনের এক প্রাণকেন্দ্রে।
আজকের প্রজন্মের কাছে দৃশ্যটি হয়তো কল্পনার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু একসময় এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বকুলতলার ছিল নিজস্ব এক পরিচয়। কবি, লেখক, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের নিয়মিত আনাগোনায় সন্ধ্যার পর জায়গাটি মুখর হয়ে উঠত।
কোনো দিন আলোচনা হতো নতুন লেখা নিয়ে। কোনো দিন নাটকের মহড়া কিংবা মঞ্চায়নের প্রস্তুতি। আবার কোনো দিন শুধুই আড্ডা, কিন্তু সেই আড্ডাও ছিল সৃষ্টিশীল। একটি কবিতার পঙ্ক্তি থেকে শুরু হয়ে আলোচনা চলে যেত সাহিত্য থেকে সমাজে, সমাজ থেকে সংস্কৃতিতে। কখনো তর্ক, কখনো হাসি, কখনো গানের সুর, সব মিলিয়ে বকুলতলা ছিল এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসর।
এই আড্ডার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মানুষ।
একই জায়গায় বসতেন অভিজ্ঞ ও নবীন। প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মীর অভিজ্ঞতার পাশে জায়গা করে নিত তরুণের নতুন স্বপ্ন। কেউ নিজের লেখা পড়ে শোনাতেন, কেউ ভুল ধরিয়ে দিতেন, কেউ উৎসাহ দিতেন। এভাবেই তৈরি হতো সাংস্কৃতিক বন্ধন। অনেক তরুণের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পথে প্রথম পা রাখার পেছনে এই পরিবেশের প্রভাব ছিল।
বকুলতলা তাই শুধু আড্ডার জায়গা ছিল না; ছিল সাংস্কৃতিক চর্চার এক অনানুষ্ঠানিক পাঠশালা।
বকুলতলার আড্ডা থেকেই উঠে এসেছে দেশবরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, চলচ্চিত্র অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, গীতিকার, সুরকার ও চিত্রশিল্পী। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক আমজাদ হোসেন, বাংলার মুকুটহীন নবাব অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন, সুরকার ওস্তাদ ফজলুল হক, কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান, চিত্রশিল্পী বীরেন সোম, গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু, সাহিত্যিক সৈয়দ আব্দুস সোবহান, লেখক সৈয়দ আব্দুস সাত্তার, লেখক গোলাম মোহাম্মদ, গল্পকার আতা সরকার, মো. আজিজুর রহমানসহ অসংখ্য গুণীজন।
সেই সময় জামালপুরে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও ছিল মানুষের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র। নাটক, সংগীত, কবিতা, আবৃত্তি কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে শহরে তৈরি হতো উৎসবের আবহ। আর এসব আয়োজনের নেপথ্যের অনেক আলোচনা, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত বকুলতলার নাম। পাশেই ছিল পাবলিক হল ও পাবলিক লাইব্রেরির মতো দুটি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখানে সংস্কৃতি ছিল মানুষের নাগালের মধ্যে। কোনো বিশেষ পরিচয় বা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিল না। যে আসতে চাইত, সে আসত। যে শুনতে চাইত, সে শুনত। যে বলতে চাইত, সে বলত। আর যে স্বপ্ন দেখতে চাইত, তার জন্যও ছিল জায়গা।
সময় অবশ্য থেমে থাকে না। শহরের চেহারা বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। প্রযুক্তি মানুষের বিনোদনকে ঘরের ভেতর, এমনকি হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন মুহূর্তেই কবিতা প্রকাশ করা যায়, গান শোনা যায়, নাটক দেখা যায়। কিন্তু সেই মুখোমুখি বসার উষ্ণতা, একসঙ্গে হাসার শব্দ, তর্কের উত্তাপ কিংবা হঠাৎ কারও কণ্ঠে গান, তার বিকল্প কি সত্যিই তৈরি হয়েছে? বকুলতলার স্মৃতি এই প্রশ্নই সামনে আনে।
যারা সেই সময় দেখেছেন, তাঁদের কাছে বকুলতলা একটি জায়গার নাম নয়, একটি সময়ের নাম। এমন একটি সময়, যখন একটি গাছতলার ছায়াও একটি শহরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারত। যখন একটি কবিতার খাতা কয়েকজন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে বসিয়ে রাখতে পারত। যখন একটি নাটকের স্বপ্ন নিয়ে তরুণেরা সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা কাটিয়ে দিতে পারতেন। আজ হয়তো সেই দৃশ্য নেই। নেই আগের মতো সেই আড্ডা, সেই কোলাহল, সেই সাংস্কৃতিক ব্যস্ততা। কিন্তু স্মৃতির শহরে বকুলতলা এখনো ঠিক আগের মতোই আছে।
চোখ বন্ধ করলে যেন আবার দেখা যায় সন্ধ্যার ম্লান আলো, মাথার ওপর বকুলগাছ, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সাদা ফুল, কয়েকজন তরুণের উত্তপ্ত আলোচনা, দূর থেকে ভেসে আসা…




