প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ঘরকে আরও স্মার্ট করে তোলার প্রতিযোগিতায় এবার নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে অ্যাপল। দীর্ঘদিন ধরে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ডিজিটাল সেবার বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এবার ঘরের দৈনন্দিন কাজকর্মকে আরও সহজ করতে স্মার্ট হোম প্রযুক্তিতে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। ১৩ অক্টোবর নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানটির ‘Welcome Home’ আয়োজন ঘিরে প্রযুক্তি দুনিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।
প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ আয়োজনে অ্যাপল নতুন স্মার্ট হোম হাব, উন্নত সিরি এআই-সমর্থিত ডিভাইস এবং হোমপড মিনি ও অ্যাপল টিভির হালনাগাদ সংস্করণ সামনে আনতে পারে। তবে পণ্যগুলোর চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্য, দাম ও বাজারে আসার সময় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা রয়েছে।
ঘরের দেয়ালেই থাকবে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র
অ্যাপলের সম্ভাব্য নতুন পণ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে আইপ্যাডের মতো দেখতে একটি স্মার্ট হোম ডিসপ্লে। গুজব ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি দেয়ালে স্থাপন করা অথবা টেবিলের ওপর রাখা যাবে। এর মাধ্যমে ঘরের বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য ও ডিজিটাল সেবা এক জায়গা থেকে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
ধরা যাক, ঘরে প্রবেশের আগে দরজার স্মার্ট বেল থেকে আগত ব্যক্তির উপস্থিতি জানা গেল। একই নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে দরজার স্মার্ট লক, ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র কিংবা সংযুক্ত বাতির অবস্থা দেখা গেল। পরিবারের সদস্যদের ক্যালেন্ডার, আবহাওয়ার তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় আপডেটও একই পর্দায় পাওয়া যেতে পারে। এ ধরনের সুবিধা বাস্তবায়িত হলে ঘরের বিভিন্ন যন্ত্র আলাদাভাবে পরিচালনার প্রয়োজন কমবে।
তবে এসব সুবিধা নির্ভর করবে ডিভাইসটির প্রকৃত সক্ষমতা, সমর্থিত আনুষঙ্গিক যন্ত্র এবং অ্যাপলের সফটওয়্যার ব্যবস্থার ওপর।
সিরি এআইয়ের ওপর কেন এত গুরুত্ব
স্মার্ট হোমের ভবিষ্যৎ কেবল যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ব্যবহারকারী কী চান, তা বুঝে সহজে কাজ সম্পন্ন করাই এ প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অ্যাপলের ভার্চুয়াল সহকারী সিরি এবং এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সক্ষমতা।
উন্নত এআই-সমর্থিত সিরি ব্যবহারকারীকে স্বাভাবিক ভাষায় নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। যেমন, নির্দিষ্ট সময়ে বাতি জ্বালানো, ঘরের তাপমাত্রা পরিবর্তন করা কিংবা সংযুক্ত যন্ত্রের অবস্থা জানতে চাওয়া। একাধিক নির্দেশের সমন্বয়ে কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা বাড়লে স্মার্ট হোম ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারে।
তবে শুধু ভয়েস কমান্ডের সুবিধা থাকলেই একটি স্মার্ট হোম সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে না। ব্যবহারকারীর নির্দেশ যথাযথভাবে বোঝা, বিভিন্ন যন্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ সম্পন্ন করাই হবে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
হোমপড ও অ্যাপল টিভিতেও আসতে পারে পরিবর্তন
স্মার্ট হোম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অ্যাপলের হোমপড মিনি স্মার্ট স্পিকার এবং অ্যাপল টিভির নতুন সংস্করণ নিয়েও আলোচনা চলছে। নতুন প্রসেসর, উন্নত কর্মক্ষমতা এবং সিরি এআইয়ের সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় এসব পণ্যের সম্ভাব্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে।
হোমপড মিনি মূলত ঘরে গান শোনা ও ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে অ্যাপল টিভি টেলিভিশনে ডিজিটাল বিনোদন ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এসব ডিভাইসের সঙ্গে নতুন স্মার্ট হোম হাবের কার্যকর সমন্বয় তৈরি হলে অ্যাপলের পণ্য ব্যবহারকারীরা ঘরের বিনোদন ও যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা পেতে পারেন।
তবে এসব সম্ভাব্য পরিবর্তনের চূড়ান্ত চিত্র জানতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
প্রতিযোগিতার বাজারে অ্যাপলের নতুন চ্যালেঞ্জ
স্মার্ট হোম বাজারে অ্যাপল একা নয়। অ্যামাজনের ইকো ও রিং ডিভাইস এবং গুগল হোমের মতো ব্যবস্থা ইতোমধ্যে ব্যবহারকারীদের ঘরের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিচ্ছে। ফলে অ্যাপলের সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন পণ্য তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় সহজ, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অ্যাপলের স্মার্ট হোম ডিভাইস অন্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রের সঙ্গে কতটা সহজে কাজ করবে। স্মার্ট হোম ব্যবস্থায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যন্ত্র ব্যবহার করা স্বাভাবিক। কোনো ব্যবস্থা যদি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা কমাতে পারে।
এ ছাড়া ডিভাইস স্থাপন ও সংযোগের জটিলতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার সমর্থনও এ বাজারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্মার্ট হোমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা
স্মার্ট হোম প্রযুক্তি একসময় মূলত বিলাসী সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন এর ব্যবহারিক গুরুত্ব বাড়ছে। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা, ঘরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ করার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
অ্যাপলের নতুন উদ্যোগ সফল হলে প্রতিষ্ঠানটি তার বিদ্যমান ডিভাইস ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাকে ঘিরে আরও বিস্তৃত স্মার্ট হোম পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। তবে প্রযুক্তির আকর্ষণীয় নকশা বা উন্নত এআইয়ের প্রচারই শেষ কথা নয়। সাধারণ ব্যবহারকারী কত সহজে এটি ব্যবহার করতে পারবেন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যন্ত্রের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্য থাকবে এবং ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সাফল্য নির্ধারণ করবে এসব বিষয়ই।
অ্যাপলের ‘Welcome Home’ আয়োজন তাই শুধু নতুন কিছু গ্যাজেট উন্মোচনের বিষয় নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি ঘরের প্রযুক্তিকে কতটা সমন্বিত ও ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে পারে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

