সিংহজানীর সকাল তখনও আজকের মতো শব্দে ভারী হয়নি। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে নৌকা এগিয়ে আসছে। ঘাটে নেমে কৃষকরা কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ কাঁধে গামছায় বাঁধা খাজনার টাকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন একটি নির্দিষ্ট ঠিকানার দিকে। সামনে পুরোনো দালান। বারান্দায় নায়েব। পাশে গোমস্তা-পেশকার। কারও হাতে হিসাবের খাতা, কারও সামনে জমির কাগজ। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে এক প্রজা জমির খাজনা দিতে এসেছেন নাটোর কাচারীতে।
সেই দৃশ্য সময়ের পিঠে হারিয়ে গেছে। নেই সেই দালান, নেই নায়েবের ডাক, নেই খাজনার খাতা। কিন্তু সিংহজানীর মাটিতে এখনো বেঁচে আছে ‘নাটোর কাচারী’ নামটি। কাচারী মোড়, কাচারী পুকুর, কাচারীপাড়া স্থাননামগুলো যেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের শেষ চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় ইতিহাসের স্মৃতিতে এই কাচারির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাটোর রাজার নাম। লোকমুখে এটি ‘নাটোর কাচারী’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধানে এসে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে দাঁড়ায়, সেটি হলো ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই কাচারী? এর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই। সময়টা অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী জমিদারি প্রতিষ্ঠান ছিল নাটোর রাজ। ১৭৪৮ সালে স্বামী রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পর জমিদারির দায়িত্ব নেন রানী ভবানী। বিস্তৃত জমিদারি পরিচালনা, রাজস্ব আদায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কাচারী বা প্রশাসনিক কেন্দ্রের প্রয়োজন ছিল।।সিংহজানীও তখন গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। আধুনিক সড়ক যোগাযোগের যুগ আসেনি। নদীই ছিল মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ। ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে নৌকা ভিড়ত, পণ্য উঠত নামত, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত। নদীর সঙ্গে গড়ে উঠত হাট-বাজার; আর হাট-বাজার মানেই ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজস্বের সম্ভাবনা।
এই বাস্তবতায় সিংহজানীতে জমিদারি কাচারী স্থাপন করা অস্বাভাবিক নয়। স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একাংশের ধারণা, রানী ভবানীর শাসনামলেই অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে এখানে নাটোর রাজের কাচারী প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এখানেই ইতিহাসের প্রতি সতর্কতা জরুরি। ১৭৫০, ১৭৬০ কিংবা ১৭৬৫ কোনো একটি সালকে প্রতিষ্ঠার নিশ্চিত বছর হিসেবে উল্লেখ করার মতো প্রত্যক্ষ দলিল এখনো পাওয়া যায়নি। তাই ১৭৪৮ সালের পর থেকে ১৭৬৫ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে কাচারীটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকতে পারে এটিকে সম্ভাব্য সময়কাল হিসেবেই দেখা উচিত। অনুমানকে ইতিহাসের চূড়ান্ত সত্য বানানোর সুযোগ নেই।
জমিদারি আমলে কাচারী শুধু একটি ভবন ছিল না। এটি ছিল রাজস্ব আদায় ও স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্র। খাজনা আদায়, জমির হিসাব, বন্দোবস্ত, প্রজাদের অভিযোগ কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকতেন নায়েব, গোমস্তা, পেশকারসহ জমিদারির কর্মচারীরা।
দূরের গ্রামের কৃষককে তাই খাজনা দিতে ছুটে আসতে হতো এখানে। কারও জমির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন, কারও খাজনা বকেয়া, কারও বন্দোবস্তের আবেদন। বারান্দায় দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো জমিদার ও প্রজার সম্পর্কের এক জটিল ইতিহাস। জমিদার ছিলেন দূরে, কিন্তু তাঁর ক্ষমতার মুখ দেখা যেত কাচারির বারান্দায়।
সিংহজানীর কাচারির ইতিহাসও একসময় একক কোনো জমিদারি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় ইতিহাসে নাটোর রাজের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে গৌরীপুর জমিদার পরিবারের কাচারির প্রসঙ্গও আসে। দয়াময়ী মন্দির ও কৃষ্ণপুরকে ঘিরে গৌরীপুর জমিদার পরিবারের নানা ঐতিহাসিক সূত্র রয়েছে।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে জমিদারি মালিকানা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও কাচারির ব্যবহার বদলেছে। কিন্তু ‘কাচারী’ হিসেবে স্থানটির স্মৃতি টিকে গেছে। আজ যে নামটি নাটোর রাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বেঁচে আছে, তার সঙ্গে পরবর্তী গৌরীপুর জমিদারি ব্যবস্থার সম্পর্কও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভের পর রাজস্ব প্রশাসনে বড় পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশ শাসনের বিস্তারের সঙ্গে জমিদারি ব্যবস্থাও নতুন কাঠামো পায়। পরবর্তী সময়ে নাটোর জমিদারির বিভিন্ন অংশের মালিকানা পরিবর্তিত হয়। সিংহজানী অঞ্চল আজকের জামালপুরে গৌরীপুরের জমিদার পরিবারের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর কেটে যায় আরও বহু বছর। উনিশ শতক পেরিয়ে বিশ শতক। শেষ পর্যন্ত বিলুপ্তির পথে যায় জমিদারি ব্যবস্থা।
১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন জমিদারি প্রথা বিলোপের পথ তৈরি করে। জমিদার নেই, জমিদারি নেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে পুরোনো কাচারিগুলোও। যে বারান্দায় একসময় প্রজাদের ভিড় থাকত, সেখানে নেমে আসে নীরবতা।
সিংহজানীর কাচারী পুকুরের নাম সরকারি নথিতেও পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সেই পুকুরও ভরাট হয়েছে। স্থাপনা মুছে গেছে, জায়গা নিয়েছে কংক্রিট। অথচ স্থাননামটি এখনো বলে যায় এখানে একসময় ছিল কাচারী।
একটি শহরের ইতিহাস সবসময় ইট-পাথরের দেয়ালে লেখা থাকে না। কখনো তা টিকে থাকে একটি পুকুরের নামে, কখনো একটি মোড়ের পরিচয়ে, কখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসা একটি পুরোনো শব্দে। তাই নাটোর কাচারীর ইতিহাস উদ্ধারে প্রয়োজন পুরোনো নথির গভীরে যাওয়া নাটোর রাজের দলিল, ব্রিটিশ আমলের রাজস্ব রেকর্ড, জেলা গেজেটিয়ার, পুরোনো খতিয়ান, সিএস-এসএ জরিপ এবং জমিদারি বন্দোবস্তের কাগজপত্র। প্রয়োজন প্রবীণদের স্মৃতিও সংগ্রহ করা। কারণ স্থাপনা হারিয়ে গেলেও স্মৃতির ভেতর অনেক সময় থেকে যায় তার শেষ চিহ্ন।
জামালপুরকে বুঝতে হলে শুধু আজকের শহরের দিকে তাকালে চলবে না। ফিরে তাকাতে হবে সিংহজানীর দিকে, ব্রহ্মপুত্রের পুরোনো ঘাটের দিকে, হাট-বাজারের দিকে। দেখতে হবে কীভাবে নদীকেন্দ্রিক একটি জনপদ ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক শহরে পরিণত হয়েছে।
নাটোর কাচারী সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।
জমিদারি নেই। নেই নায়েবের ডাক, খাজনার খাতা, প্রজার দীর্ঘ অপেক্ষা। নেই সেই পুরোনো দালানও। তবু ‘নাটোর কাচারী’ নামটি রয়ে গেছে, একটি বিলুপ্ত যুগের শেষ স্মৃতি হয়ে।
হয়তো মাটির নিচে, হয়তো কোনো পুরোনো নথির পাতায় এখনো ঘুমিয়ে আছে সেই কাচারীর অজানা ইতিহাস। অপেক্ষা শুধু কেউ কি একদিন সেই ঘুমন্ত পাতাটি খুলবে?




