
রুমা আক্তার ।।
একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কথা শোনে, খাতায় লেখে, বাড়িতে ফিরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। তার সামনে পাঠ্যবই, পরীক্ষার রুটিন আর ভালো ফল করার প্রত্যাশা। বছরের পর বছর এভাবেই তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে চলে। একসময় সে সনদ হাতে নেয়, পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠে কিংবা উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়ায়। কিন্তু এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে সে কতটা নিজের মতো করে চিন্তা করতে শিখল? কতটা প্রশ্ন করতে পারল? বইয়ের পাতায় যা পড়েছে, বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে তার কতটা পরিচয় ঘটল?
প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর ততটা সহজ নয়। কারণ, শিক্ষা কেবল নির্ধারিত পাঠ্যক্রম শেষ করা কিংবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে কৌতূহলী করে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়, ভিন্নমত বুঝতে সাহায্য করে এবং নিজের চারপাশের পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শেখায়। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এসব অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সহশিক্ষা ও সৃজনশীল চর্চা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, বিতর্কচর্চা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা বিদ্যালয়ের বাইরে প্রকৃতিকে জানার সুযোগ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো পাঠ্যবইয়ের বিকল্প নয়, বরং পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যম। কিন্তু বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসব সুযোগ কতটা সহজলভ্য? বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাদের জন্য জ্ঞানের জগৎ কতটা উন্মুক্ত?
পাঠ্যবইয়ের বাইরের শিক্ষার সংকীর্ণ পরিসর
শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোয় পরীক্ষার ফলের গুরুত্ব অনেক। শিক্ষার্থী ভালো নম্বর পাবে, পরবর্তী শ্রেণিতে উঠবে, ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে একটি ভালো পেশায় যুক্ত হবে, এটাই অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বড় প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সনদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন ভালো ফল করাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বইয়ে উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা পরিবেশ সম্পর্কে পড়তে পারে। কিন্তু সে যদি নিজের বিদ্যালয়ের আশপাশের জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ না পায়, কোনো সহজ পরীক্ষা করে না দেখে কিংবা কোনো বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর নিজে অনুসন্ধান করতে না পারে, তাহলে তার শেখা অনেক ক্ষেত্রেই বইয়ের তথ্য মনে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
একইভাবে, বাংলা পাঠ্যবইয়ে গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ পড়লেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য লেখকের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি না হলে তার পাঠজগৎ সীমিত থেকে যেতে পারে। ইতিহাস পড়লেও স্থানীয় কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রবীণ মানুষের স্মৃতি কিংবা এলাকার সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ না থাকলে ইতিহাস তার কাছে মুখস্থ করার বিষয় হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
অর্থাৎ, পাঠ্যবই শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে; কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর চিন্তা, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার জগৎ নির্মাণের দায়িত্বও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিতে হয়। সে জায়গাটি কি বিকশিত হচ্ছে?
হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রন্থাগার
একটি গ্রন্থাগার কেবল বই রাখার জায়গা নয়। এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিজের পছন্দের বিষয় আবিষ্কার করতে পারে। কেউ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারে, কেউ ইতিহাসের বই খুলতে পারে, কেউ উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেতে পারে। আবার কেউ হয়তো একটি বই পড়েই নতুন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। এই স্বাধীন পাঠের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে।
কিন্তু গ্রন্থাগার থাকলেই সেখানে পাঠাভ্যাস তৈরি হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত পাঠের সুযোগ, উপযোগী বই, পাঠকের সঙ্গে বইয়ের সংযোগ এবং গ্রন্থাগারকে ঘিরে একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার যদি কেবল নির্দিষ্ট সময়ে খোলা থাকে, শিক্ষার্থীরা বই বাড়িতে নেওয়ার সুযোগ না পায় কিংবা গ্রন্থাগার ব্যবহারের কোনো নিয়মিত কার্যক্রম না থাকে, তাহলে তার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।
গ্রামীণ জনপদে বিদ্যালয়ের বাইরের গণগ্রন্থাগারগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব পাঠাগার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থী, তরুণ, শিক্ষক ও সাধারণ পাঠকের জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু কোনো পাঠাগারে বইয়ের সংগ্রহ থাকলেও যদি পাঠক নিয়মিত না আসেন, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার যোগাযোগ না থাকে কিংবা পাঠাগারকে ঘিরে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন না হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তার সামাজিক ভূমিকা হারাতে পারে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: গ্রন্থাগারে পাঠক কমে যাওয়ার কারণ কেবল মানুষের বই পড়ার অনাগ্রহ নয়। বইয়ের সহজলভ্যতা, পাঠাগারের অবস্থান, খোলার সময়, পরিবেশ, বইয়ের বৈচিত্র্য, পাঠকের আর্থিক সামর্থ্য এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক শিক্ষার্থীর হয়তো পড়ার আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু তাদের উপযোগী বই পাওয়ার জায়গা নেই। কেউ বিদ্যালয়ের পরে পরিবারের কাজে ব্যস্ত থাকে, কেউ দূরের পাঠাগারে যাওয়ার সুযোগ পায় না।
তাই গ্রামীণ পাঠাগারকে ঘিরে প্রশ্নটি শুধু পাঠক কমছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, পাঠাগারগুলো নতুন পাঠক তৈরির জন্য কী করছে? শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে কি? বইপাঠের আসর, গল্প বলা, বই আলোচনা, দেয়ালপত্রিকা কিংবা ছোটদের বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার আয়োজন করা হচ্ছে কি?
একটি কার্যকর পাঠাগার শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের বই নিয়ে কথা বলার, নিজের মত প্রকাশের এবং অন্যের মত শোনার সুযোগ তৈরি করে। এই চর্চা বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকেও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বিজ্ঞানচর্চা: মুখস্থ জ্ঞানের বাইরে অনুসন্ধানের আনন্দ
বিজ্ঞান শেখার মূল শক্তি কেবল সূত্র মনে রাখা নয়, বরং প্রশ্ন করা, পর্যবেক্ষণ করা, পরীক্ষা করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। একটি বীজ কীভাবে অঙ্কুরিত হয়, বৃষ্টির পানি কোথায় যায়, নদীর পানি কেন ঘোলা হয়, কিংবা গ্রামের পুকুরে মাছের সংখ্যা কেন কমে বা বাড়ে, এসব প্রশ্নের মধ্যেও বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ রয়েছে।
গ্রামীণ পরিবেশে বিজ্ঞান শেখার উপাদান কম নয়। কৃষিকাজ, মাটি, পানি, আবহাওয়া, উদ্ভিদ, প্রাণী, স্থানীয় প্রযুক্তি এবং পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। প্রয়োজন কেবল এসব অভিজ্ঞতাকে পরিকল্পিত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা।
কিন্তু বিজ্ঞানচর্চা যদি শুধু বইয়ের সংজ্ঞা, সূত্র ও পরীক্ষার প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর অনুসন্ধিৎসা বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে কি না, হাতে-কলমে পরীক্ষা করার সময় দেওয়া হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
সব বিদ্যালয়ে আধুনিক বিজ্ঞানাগার নির্মাণ বা ব্যয়বহুল সরঞ্জাম কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু সীমিত উপকরণ দিয়েও পর্যবেক্ষণ, সহজ পরীক্ষা, বিজ্ঞানবিষয়ক দেয়ালপত্রিকা, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কিংবা বিজ্ঞানবিষয়ক কুইজ আয়োজন করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের উদ্যোগ, প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
বিজ্ঞানচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভুল থেকে শেখা। পরীক্ষায় ভুল উত্তর দিলে নম্বর কমে, কিন্তু অনুসন্ধানী কাজে কোনো অনুমান ভুল প্রমাণিত হওয়াও একটি অর্জন। কারণ, এতে শিক্ষার্থী বুঝতে শেখে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রমাণ প্রয়োজন। এই মনোভাব শুধু বিজ্ঞানেই নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যুক্তিবাদী চিন্তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
বিতর্কচর্চা: ভিন্নমতকে বোঝার শিক্ষা
শিক্ষার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো মানুষকে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে এবং অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখানো। বিতর্কচর্চা এই দক্ষতা গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম। কোনো বিষয়ে নিজের মতের পক্ষে যুক্তি সাজানো, বিপরীত মতের বক্তব্য বোঝা, তথ্য যাচাই করা এবং যুক্তির ভিত্তিতে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা, এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়ক।
কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, পাঠচক্র কিংবা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মত প্রকাশের আয়োজন নিয়মিত হয় কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোথাও এসব আয়োজন থাকলেও তা হয়তো নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজের বক্তব্য প্রকাশ কিংবা জনসমক্ষে কথা বলার অনুশীলনের সুযোগ পায় না।
বিতর্কের গুরুত্ব শুধু সুন্দর করে কথা বলা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষার্থীদের শেখায়, কোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলেই প্রতিপক্ষ শত্রু হয়ে যায় না। যুক্তির ভিত্তিতে দ্বিমত করা যায়, অন্যের বক্তব্যের সমালোচনা করা যায়, আবার প্রয়োজন হলে নিজের ভুলও স্বীকার করা যায়।
একটি সমাজে এই চর্চার প্রয়োজন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে না, সে অনেক সময় প্রচলিত ধারণাকেই চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেয়। আর যে শিক্ষার্থী ভিন্নমত শুনতে শেখে না, তার পক্ষে বহুত্ববাদী সমাজের বাস্তবতা বোঝা কঠিন।
বিদ্যালয়ে নিয়মিত বিতর্ক আয়োজনের জন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে স্থানীয় সমস্যা, পরিবেশ, প্রযুক্তি, বইপাঠ কিংবা সামাজিক বিষয় নিয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার্থীরা যেন ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারে এবং মত প্রকাশের সুযোগ পায়।
খেলাধুলা: শিক্ষার বাইরের বিষয় নয়
খেলাধুলাকে অনেক সময় পড়াশোনার অবসরকালীন কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। অথচ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি দলগত কাজ, নিয়ম মেনে চলা, নেতৃত্ব, ধৈর্য এবং পরাজয় মেনে নেওয়ার শিক্ষা খেলাধুলার মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ না থাকলে শিক্ষার্থীদের বিকাশের এই ক্ষেত্রটি সংকুচিত হয়। মাঠের অভাব, খেলার সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপে খেলাধুলাকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব কারণের বাস্তব চিত্র প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন।
গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ থাকলেও সেটি খেলাধুলার উপযোগী কি না, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মাঠ ব্যবহারের সুযোগ পায় কি না এবং মেয়েদের অংশগ্রহণের জন্য নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ রয়েছে কি না, সেসব প্রশ্নও জরুরি। কেবল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করলেই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলার চাহিদা পূরণ হয় না।
খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতা শেখায়। জয় যেমন আনন্দের, পরাজয়ও তেমনি শেখার অভিজ্ঞতা। এই শিক্ষা পরীক্ষার নম্বর দিয়ে পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু ব্যক্তিত্ব গঠনে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল পৃথিবী: সুযোগ আছে, নতুন চ্যালেঞ্জও আছে
ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। অনলাইন বই, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভার্চুয়াল জাদুঘর, বিজ্ঞানবিষয়ক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন উন্মুক্ত শিক্ষাসম্পদ ব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষের বাইরে শেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু প্রযুক্তির উপস্থিতি মানেই শেখার সুযোগ সবার জন্য সমান হয়ে গেছে, এমন নয়। ডিভাইস, ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং উপযুক্ত শিক্ষাসম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা পরিবারভেদে ভিন্ন হতে পারে। ফলে প্রযুক্তি একদিকে শিক্ষার সুযোগ বাড়ালেও অন্যদিকে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
এ ছাড়া অনলাইনে তথ্য পাওয়া আর সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো বক্তব্য, ছবি কিংবা ভিডিও কতটা নির্ভরযোগ্য, তা বোঝার দক্ষতা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখা তৈরি করা বা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হলেও উত্তরটি বুঝে নেওয়া, তথ্য যাচাই করা এবং নিজের চিন্তা প্রয়োগ করার দায়িত্ব শিক্ষার্থীরই থাকে।
তাই ডিজিটাল শিক্ষার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো নয়। এর সঙ্গে তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল ব্যবহার, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাসও যুক্ত করতে হবে।
সুযোগের বৈষম্য: শহর ও গ্রামের ব্যবধান
পাঠ্যবইয়ের বাইরে শেখার সুযোগের প্রশ্নটি আলোচনায় এলে গ্রাম ও শহরের বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। সব শহুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে, কিংবা সব গ্রামের বিদ্যালয়েই সুযোগের অভাব, এমন সাধারণীকরণ সঠিক নয়। তবু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানচর্চার উপকরণ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
একটি শহরের শিক্ষার্থী হয়তো সহজে কোনো জাদুঘর, বিজ্ঞানকেন্দ্র, বইমেলা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পায়। গ্রামের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা সম্ভব, কিন্তু তার জন্য যাতায়াত, অর্থ, সময় ও স্থানীয় উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে। আবার গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা প্রকৃতি, কৃষি ও স্থানীয় সমাজকে কাছ থেকে জানার যে সুযোগ পায়, তা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগালে শিক্ষার অনন্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, সমাধান কেবল শহরের মতো অবকাঠামো তৈরি করা নয়। বরং স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ বাড়ানো। নদী, কৃষিজমি, স্থানীয় বাজার, ঐতিহাসিক স্থাপনা, পেশাজীবী মানুষ এবং এলাকার সামাজিক ইতিহাসও শিক্ষার উপকরণ হতে পারে।
জামালপুরের মতো জেলাগুলোতে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন ও নাগরিক উদ্যোগগুলোকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি বিস্তৃত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তার জন্য আগে জানতে হবে, কোথায় কী সুযোগ রয়েছে, সেগুলো কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রধান বাধাগুলো কী।
দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ের নয়
শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত করার দায়িত্ব কেবল শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক, স্থানীয় সরকার, গ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোরও ভূমিকা রয়েছে।
বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পাঠচক্র, বিতর্ক, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। প্রতিটি আয়োজনের জন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই। ছোট পরিসরে শুরু করে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। তবে এসব কার্যক্রম যেন কেবল কাগজে-কলমে বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রন্থাগারগুলোকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে বইয়ের সংগ্রহের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠচক্র, বই আলোচনা এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। স্থানীয় লেখক, শিক্ষক, বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ব্যক্তি, কৃষিবিদ, চিকিৎসক কিংবা বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার যোগসূত্র খুঁজে পাবে।
অভিভাবকদেরও সন্তানের সাফল্যকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার না করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সন্তান কী পড়ছে, কী জানতে চাইছে, কী নিয়ে ভাবছে এবং কোন বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছে, সেসব বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব হলো, সহশিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন করা। কতটি বিদ্যালয়ে ব্যবহারযোগ্য গ্রন্থাগার রয়েছে, কতটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত বিজ্ঞানচর্চা হয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ কতটা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কতটা নিয়মিত, এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা যেতে পারে। শুধু অবকাঠামো আছে কি না, তা নয়; সেটি শিক্ষার্থীদের কাজে লাগছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
শিক্ষার সাফল্য কী দিয়ে মাপা হবে?
পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার সাফল্য পরিমাপের একমাত্র উপায় নয়। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালোভাবে পড়তে পারে, তথ্য বুঝতে পারে, যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে, এসবও তার শেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এর অর্থ এই নয় যে পাঠ্যবই, পরীক্ষা কিংবা ভালো ফলের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে হবে। বরং এগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার অন্যান্য লক্ষ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, বাস্তব জীবনে মানুষকে কেবল মুখস্থ তথ্য পুনরাবৃত্তি করতে হয় না। নতুন পরিস্থিতি বুঝতে হয়, সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অন্যের সঙ্গে কাজ করতে হয় এবং পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়।
একটি শিক্ষাব্যবস্থা যদি শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে, তাহলে তাদের শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ অপ্রকাশিত থেকে যেতে পারে। বিপরীতে, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অনুসন্ধান, পাঠাভ্যাস, বিজ্ঞানচর্চা, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগ থাকলে শেখার অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও সক্ষমতার বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। প্রত্যেক শিক্ষার্থী একই বিষয়ে সমান দক্ষ হবে না, একই পদ্ধতিতে শিখবে না। কিন্তু প্রত্যেকেরই শেখার, প্রশ্ন করার এবং নিজের সম্ভাবনা আবিষ্কারের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে একটি পৃথিবী অপেক্ষা করছে
একটি বই একজন শিক্ষার্থীকে এমন কোনো সময়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, যে সময় সে কখনো দেখেনি। একটি বিজ্ঞান পরীক্ষা তাকে নিজের চোখে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে শেখাতে পারে। একটি বিতর্ক তাকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে, নিজের মতের বাইরে অন্যের যুক্তিও থাকতে পারে। একটি খেলার মাঠ তাকে সহযোগিতা ও পরাজয় মেনে নেওয়ার শিক্ষা দিতে পারে। একটি দেয়ালপত্রিকা তাকে প্রথমবারের মতো নিজের লেখা অন্যের সামনে তুলে ধরার সাহস দিতে পারে।
এসব অভিজ্ঞতা পাঠ্যবইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং শিক্ষার পরিপূরক। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি মানুষকে জ্ঞানী, বিবেচক, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলা হয়, তাহলে এসব অভিজ্ঞতাকে প্রান্তিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গ্রামীণ বিদ্যালয় ও পাঠাগারগুলোর সামনে তাই বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও স্থানীয় পরিবেশ, মানুষের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শেখার পরিসর তৈরি করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, নিয়মিত উদ্যোগ এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের কত পৃষ্ঠা শেষ করেছে। প্রশ্ন হলো, সেই বই তাদের পৃথিবীকে কতটা বড় করে দিয়েছে। তারা কতটা নতুন প্রশ্ন করতে শিখেছে, কতটা যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারছে, কতটা অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে পারছে এবং কতটা স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছে।
কারণ, শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখা উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রকাশ ঘটে মানুষের চিন্তায়, আচরণে, কৌতূহলে এবং জীবনকে বোঝার ক্ষমতায়। পাঠ্যবইয়ের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় যত সমৃদ্ধ হবে, শিক্ষাও তত বেশি জীবন্ত ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
