Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
ইতিহাস

কী দুর্ভাগ্য জাফরের!

কী দুর্ভাগ্য জাফরের!

“কিতনা হ্যায় বদনসীব জাফর, দাফন কে লিয়ে
দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মে।”

কী দুর্ভাগ্য জাফরের!

প্রিয়জনের শহরে, নিজের মানুষের মাটিতে, শেষবার শুয়ে থাকার জন্যও তিনি পেলেন না দুই গজ মাটি!

একসময় যার মাথায় শোভা পেয়েছ দিল্লির মুকুট, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শতাব্দীপ্রাচীন মুঘল সাম্রাজ্যের আলো, সেই মানুষটিই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরিণত হলেন এক নির্বাসিত বৃদ্ধে। যে দিল্লি তাঁর ছিল, সে দিল্লিতেই তাঁর কবরের জন্য দু’গজ মাটি হল না। ভারত তাঁর জন্মভূমি, অথচ মৃত্যুর পরও সেই মাটির অধিকারটুকু তাঁর ভাগ্যে জুটল না।

তিনি বাহাদুর শাহ জাফর, মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট।

যদিও সাম্রাজ্য তখন আর আগের মতো ছিল না। লালকেল্লার দেয়ালের বাইরে তাঁর ক্ষমতার সীমা ছিল প্রায় অস্তিত্বহীন। দিল্লির সিংহাসন ছিল, কিন্তু সাম্রাজ্য ছিল না; রাজমুকুট ছিল, কিন্তু রাজ্য ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছায়ায় তিনি ছিলেন মূলত নামমাত্র সম্রাট।

তবু ১৮৫৭ সালে যখন ভারতজুড়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল, বিদ্রোহী সিপাহিরা ফিরে এল দিল্লিতে। তারা খুঁজে নিল সেই বৃদ্ধ সম্রাটকেই।

জাফর তখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ।
কিন্তু তাঁর নামের মধ্যে তখনও ছিল একটি ইতিহাসের শক্তি।

বিদ্রোহীরা তাঁকে সামনে রেখে নিজেদের সংগ্রাম এগিয়ে নিতে থাকল। বৃদ্ধ সম্রাটও শেষ বয়সে এসে ইতিহাসের এক ভয়ংকর ঝড়ের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে গেলেন।

কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম।

দিল্লি শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের হাতে ফিরে গেল।
লালকেল্লার পতাকা বদলে গেল।
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনও ঘটল সেই ঝড়েই।

জাফর পালিয়ে আশ্রয় নিলেন হুমায়ুনের সমাধিতে।

ভাবা যায়?

এক সম্রাট, নিজের সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা-পূর্বপুরুষের সমাধিতে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজের জীবনের শেষ নিরাপদ জায়গাটুকুর সন্ধানে।

২১ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭।

ব্রিটিশ কর্মকর্তা মেজর উইলিয়াম হডসন সেখানে পৌঁছালেন। বাহাদুর শাহ জাফর আত্মসমর্পণ করলেন এবং গ্রেপ্তার হলেন।

তারপর শুরু হলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।

লালকেল্লার সম্রাটকে বন্দি করা হলো।
তাঁর বিচার হলো।
তাঁর রাজত্বের অবসান ঘোষণা করা হলো।

আর তারপর?

তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো বহু দূরের রেঙ্গুনে, আজকের মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে।

দিল্লি থেকে রেঙ্গুন। কপর্দকহীন।
একজন সম্রাটের জীবনের কী নির্মম পতন!

যে মানুষটির পূর্বপুরুষেরা ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড শাসন করেছিলেন, তাঁকেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে হলো বিদেশের মাটিতে, পরাধীন অবস্থায়।

তার সঙ্গে তখন কেবল তার অতীতের স্মৃতি।

দিল্লির স্মৃতি।

লালকেল্লার স্মৃতি।

হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের স্মৃতি।

আর ছিল কবিতা।

জাফর ছিলেন শুধু সম্রাট নন, তিনি ছিলেন একজন কবিও। নিজের বেদনা, পরাজয়, নির্বাসন ও মাতৃভূমির জন্য আকুতি তিনি কবিতায় ঢেলে দিয়েছিলেন।

তাঁর সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি যেন তাঁর নিজের ভাগ্যেরই নির্মম ঘোষণা।

“কিতনা হ্যায় বদনসীব জাফর, দাফন কে লিয়ে
দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মে।”

প্রিয়জনের গলিতে দাফন হওয়ার জন্যও দুই গজ মাটি জোটেনি। এর চেয়ে বড় নির্বাসন আর কী হতে পারে?

একজন সম্রাটের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয় কি সিংহাসন হারানো?

হয়তো নয়।

সবচেয়ে বড় পরাজয় হলো, নিজের মাটিতে ফিরে যেতে না পারা।

জাফর সেই পরাজয় নিয়েই বেঁচেছিলেন।

১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর রেঙ্গুনে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। তাঁর কবরের ওপরও দীর্ঘদিন ছিল না কোনো রাজকীয় স্মৃতিস্তম্ভ। ইতিহাসের শেষ মুঘল সম্রাট যেন নিজের মৃত্যুতেও নির্বাসিতই রয়ে গেলেন।

দিল্লির যে শহর একদিন তাঁর নামে সাড়া দিত, সেই শহর থেকে হাজার মাইল দূরে, অচেনা মাটির নিচে চাপা পড়ে রইল তাঁর শেষ নিঃশ্বাস।

কখনো কখনো ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের গল্প নয়।
ইতিহাস পরাজিতদের কান্নাও জমিয়ে রাখে।

বাহাদুর শাহ জাফরের গল্প তেমনই এক কান্নার গল্প।

একটি সাম্রাজ্যের পতনের গল্প।
একজন বৃদ্ধের নির্বাসনের গল্প।
একজন কবির অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষার গল্প।

আর সবচেয়ে বেশি, নিজের মাটিতে দুই গজ জায়গার জন্য একজন সম্রাটের আজীবন হাহাকারের গল্প।

আজও তাঁর কবিতার সেই আর্তি ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে যেন আমাদের কানে ফিসফিস করে।

কী দুর্ভাগ্য জাফরের!

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies