শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, সমাজের জন্যও গভীর বেদনার। অথচ সামান্য সচেতনতা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর অনেক ঘটনাই এড়ানো সম্ভব। তারপরও নদী, পুকুর, খাল কিংবা জলাশয়ে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের নিরাপত্তায় আমরা এখনো কতটা অসচেতন ও অপ্রস্তুত।
এরই মর্মান্তিক উদাহরণ জামালপুরের বকশীগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে ১১ বছর বয়সী সাথী আক্তারের মৃত্যু। শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের ভাটি কলকিহারা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সকালে ফুফু জুমুরী বেগমের সঙ্গে বাড়ির পশ্চিম পাশে ব্রহ্মপুত্র নদে কাপড় ধুতে গিয়েছিল সাথী। একপর্যায়ে নদীর পানিতে ডুবে যায় সে। দীর্ঘক্ষণ তাকে ভেসে উঠতে না দেখে ফুফুর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে বেলা ১২টার দিকে নদী থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একটি শিশুর এমন মৃত্যু আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। নদীঘেরা জনপদে বেড়ে ওঠা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কতটা প্রস্তুত? পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে শিশুদের জলাশয়ের কাছে যাওয়া অনেক সময় অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু নদী বা পুকুরের মতো বিপজ্জনক স্থানে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে মুহূর্তের অসতর্কতাই কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ। সাথীর মৃত্যু তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে।
বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশপাশে পুকুর, খাল, নদী ও অন্যান্য জলাশয় থাকায় শিশুদের ঝুঁকি বেশি। বর্ষা মৌসুমে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর শিশুরা চলে যায় জলাশয়ের কাছে। শিশুদের সাঁতার না জানা, বিপদ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকা এবং দ্রুত উদ্ধার করার মতো ব্যবস্থা না থাকাও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তবে শুধু অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ের পাশে প্রয়োজন অনুযায়ী বেড়া বা নিরাপদ ঘাটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নদীতীরবর্তী ও জলাশয়বেষ্টিত গ্রামগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং পানিতে পড়ে গেলে কীভাবে নিরাপদে সাহায্য চাইতে হয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে উদ্ধারকাজে প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত সাড়া দেওয়া সহজ হবে।
পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর দ্রুত সঠিক চিকিৎসা ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। তবে উদ্ধারকাজে অন্য কারও জীবন যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য নিরাপদ উদ্ধারপদ্ধতি জানা জরুরি। দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সাথী আক্তারের মৃত্যু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এই মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সেই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার রক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সরকারি উদ্যোগের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

