চাহিদার তুলনায় বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করা হচ্ছে, অথচ বাজারে সংকট কাটছে না। কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও কোনো কোনো স্থানে তা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও এই দামেও মিলছে না গ্যাস। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, আমদানি ও সরবরাহের হিসাব যদি ঠিক থাকে, তাহলে সংকট কেন?
এলপিজি এখন আর কেবল বিকল্প জ্বালানি নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার, বিশেষত শহরাঞ্চলের বাসিন্দা ও পাইপলাইনের গ্যাস-সুবিধাবঞ্চিত মানুষ রান্নার কাজে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এলপিজির সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে সংসারের ব্যয় বাড়ে, আর সরবরাহ না থাকলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ পরিবারকে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে থাকা মানুষের জন্য এই সংকট নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আমদানি বেশি হলেই বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আমদানির পর পণ্য কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, কোন পর্যায়ে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার কাছে কী পরিমাণ গ্যাস পৌঁছাচ্ছে এবং কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। কেবল আমদানির পরিসংখ্যান দিয়ে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে বাজার পরিস্থিতির তথ্য চাওয়ার পরও ১৩ দিনে প্রতিবেদন না পাওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা প্রশাসনিক সমন্বয় ও নজরদারির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংকটের সময় তথ্য সংগ্রহে এত দীর্ঘসূত্রতা থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। বাজারে পণ্যের সরবরাহ, মজুত, মূল্য ও বিক্রির প্রকৃত চিত্র নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোন জেলায় কত চাহিদা, কত সরবরাহ এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা জানা না থাকলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।
এলপিজির বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার। নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; সেই মূল্য বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিক্রেতা নির্ধারিত দামের বেশি নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থার কোনো স্তরে অনিয়ম, মজুতদারি কিংবা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে বাজারের সব সংকটকে আগাম মজুতদারি বা কারসাজির ফল ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়াইটাই এখন প্রয়োজন।
আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ রাখার যে হুঁশিয়ারি ব্যবসায়ীরা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও দাবিগুলো কী, সরবরাহের কোন পর্যায়ে তাঁরা সমস্যায় পড়ছেন এবং নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি। ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে কার্যকর সংলাপ ছাড়া এ সংকটের টেকসই সমাধান কঠিন।
জ্বালানি সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংকট দেখা দিলে তার দায় এককভাবে কোনো একটি পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমদানি যথেষ্ট হওয়ার পরও বাজারে পণ্য না পাওয়ার অর্থ সরবরাহ ও তদারকির কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি কোথায়, কার দায়িত্বে এবং কেন তা দূর করা যাচ্ছে না, তা অবশ্যই উদঘাটন করতে হবে।

