Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
সম্পাদকীয়

মাটির শিল্প বাঁচুক, বাঁচুক বাংলার ঐতিহ্য

মাটির শিল্প বাঁচুক, বাঁচুক বাংলার ঐতিহ্য

একসময় বাংলার ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, থালা, পেয়ালা আর মাটির ব্যাংক ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। মানুষের জীবনযাপন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে ছিল মৃৎশিল্প। কুমারের চাকা ঘুরত, মাটির সঙ্গে মিশে থাকত শ্রম ও সৃজনশীলতা, আর সেই মাটিতেই ফুটে উঠত বাংলার নিজস্ব শিল্পবোধ। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু আধুনিকতার এই পরিবর্তনের আড়ালে আমাদের একটি প্রাচীন শিল্প ক্রমেই হারিয়ে যাওয়ার পথে। জামালপুরের সরিষাবাড়ীর বাড়ইপটল পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের দুরবস্থা সেই সংকটেরই এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অন্যান্য উপকরণে তৈরি পণ্যের বিস্তারের ফলে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার কমেছে। মানুষের পছন্দ ও প্রয়োজনের পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একটি শিল্পের বাজার সংকুচিত হওয়া আর সেই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। সরিষাবাড়ীর মৃৎশিল্পীরা আজ ঠিক সেই অবহেলারই শিকার। তাঁদের অভিযোগ, মাটি ও জ্বালানির দাম বেড়েছে, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অথচ পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও চাহিদা বাড়েনি। ফলে পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে থেকেও তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না। অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে।

এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। মৃৎশিল্প কেবল মাটি দিয়ে কিছু ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করার কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাটি চেনার জ্ঞান, উপকরণ প্রস্তুতের কৌশল, নকশার ঐতিহ্য এবং হাতের নিপুণতা। বছরের পর বছর চর্চার মধ্য দিয়ে এই দক্ষতা তৈরি হয়। কিন্তু একটি পরিবার যখন এই পেশায় থেকে ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই কাজ ধরে রাখার প্রত্যাশা করাও কঠিন। এভাবে একটি শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু কয়েকটি পণ্যের বিলুপ্তি ঘটে না, হারিয়ে যায় স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক নারী। তাঁদের শ্রমে তৈরি হয় মাটির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, অথচ সেই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ, ন্যায্য দাম, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিকল্প বিপণনব্যবস্থা না থাকলে তাঁদের পক্ষে এই পেশায় টিকে থাকা আরও কঠিন। তাই মৃৎশিল্প রক্ষার উদ্যোগে নারী কারিগরদের প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, এই শিল্প কি কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে? সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মৃৎশিল্পকেও নতুন বাস্তবতার উপযোগী করে তোলা সম্ভব। ঘর সাজানোর সামগ্রী, নান্দনিক ফুলের টব, পরিবেশবান্ধব পণ্য, রেস্তোরাঁর বিশেষ পরিবেশনায় ব্যবহৃত তৈজসপত্র এবং লোকজ নকশার উপহারসামগ্রীর বাজারে মাটির পণ্যের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নকশা উন্নয়ন, মানসম্মত উৎপাদন, আধুনিক বিপণন, অনলাইন বিক্রির সুযোগ এবং ক্রেতাদের কাছে পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো। কেবল ঐতিহ্যের কথা বলে শিল্পীদের টিকিয়ে রাখা যাবে না; তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য টেকসই বাজারও তৈরি করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃৎশিল্পীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের প্রকৃত সমস্যা ও প্রয়োজন নিরূপণ করতে হবে। সহজ শর্তে সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদের ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, উৎপাদন ও সংরক্ষণের উপযোগী অবকাঠামো এবং মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে বিপণনকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মৃৎশিল্পকে যুক্ত করাও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি কারিগরদের সন্তানদের প্রশিক্ষণ ও নতুন নকশা তৈরিতে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি হয়।

একই সঙ্গে আমাদের ভোক্তা-মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো, স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনা এবং মাটির শিল্পের নান্দনিক মূল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এই শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ভোক্তার সদিচ্ছার ওপর সব দায় চাপানো যাবে না। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য, সহজ বাজারপ্রাপ্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করাই হবে টেকসই সমাধানের ভিত্তি।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies