সুন্নাতপাড়া গ্রামের পাহাড়ের ঢালে কয়েক একর জমিতে কৃষকদের কাসাভা চাষ দেখাচ্ছে, প্রচলিত কৃষির বাইরে বিকল্প ফসল নিয়েও ভাবার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও তুলনামূলক অনুর্বর জমিতে যেখানে ধান, সবজি বা অন্যান্য প্রচলিত ফসল চাষে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে কম পরিচর্যায় কাসাভার আবাদ কৃষকদের জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
কাসাভার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই যে, এটি শুধু একটি খাদ্যফসল নয়; এর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। কন্দ থেকে খাদ্যপণ্য, আটা ও স্টার্চ তৈরি করা যায়। শিল্পেও কাসাভা স্টার্চের ব্যবহার রয়েছে। ফলে কৃষকের জমিতে উৎপাদিত একটি কন্দ স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে কোনো নতুন ফসলকে সম্ভাবনাময় বললেই তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যায় না। কৃষকের কাছে শেষ কথা হলো লাভ। জমিতে ফলন হলো, কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেল না, তাহলে কৃষক দীর্ঘমেয়াদে সেই ফসলে থাকবেন না। তাই বকশীগঞ্জে কাসাভার চাষ সম্প্রসারণের আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বাজারব্যবস্থার ওপর।
এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কোথায় কতটুকু জমিতে চাষ হচ্ছে, উৎপাদন খরচ কত, প্রতি একরে ফলন কত, স্থানীয় বাজারে চাহিদা কেমন এবং কৃষক কী দামে বিক্রি করতে পারছেন- এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা দরকার। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্রেতা ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
শুধু কাঁচা কাসাভা বিক্রির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট আকারের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সম্ভাবনার পরিধি আরও বাড়তে পারে। কাসাভা থেকে স্টার্চ, আটা বা অন্যান্য পণ্য তৈরির উদ্যোগ স্থানীয় কৃষির সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পের সংযোগ ঘটাতে পারে। এতে কৃষক যেমন বাড়তি মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন, তেমনি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
তবে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জরুরি। কাসাভার জাত, চাষপদ্ধতি, ফলন, খাদ্য হিসেবে নিরাপদ ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে প্রক্রিয়াজাত কাসাভা খাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা থাকা প্রয়োজন। কৃষককে শুধু চারা বা কারিগরি পরামর্শ দিলেই হবে না, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটিকে বিবেচনায় নিতে হবে।
বকশীগঞ্জের পাহাড়ি এলাকায় কাসাভার বর্তমান চাষ হয়তো এখনও বড় পরিসরের কৃষি অর্থনীতির অংশ নয়। কিন্তু কৃষকের পরীক্ষামূলক উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হলে এখান থেকেই একটি নতুন কৃষি সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি হতে পারে। সাগর খাগসীর মতো কৃষকরা যখন নিজেদের অভিজ্ঞতায় জমির পরিমাণ বাড়াচ্ছেন, তখন সেটিকে কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য বিকল্প কৃষির একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশের কৃষির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বৈচিত্র্য তৈরি করা। সব জমিতে একই ফসল চাষের ধারণা থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মাটি, পানি, জলবায়ু ও জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করতে হবে। যে জমিতে প্রচলিত ফসল ভালো হয় না, সেখানে উপযোগী বিকল্প ফসল খুঁজে নেওয়াই হতে পারে কৃষির ভবিষ্যৎ কৌশলের একটি অংশ।
ফলন ভালো হলে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান, বাজার তৈরি হলে উৎপাদন যেন টেকসই হয়, আর উৎপাদন বাড়লে কৃষক যেন প্রকৃত অর্থেই লাভবান হন-এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বকশীগঞ্জের পাহাড়ি জমিতে শিমুল আলু হয়ে উঠতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প অর্থকরী ফসল। অবহেলায় পড়ে থাকা জমি তখন শুধু ফসলই দেবে না, দিতে পারে নতুন আয়, নতুন উদ্যোগ এবং সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

