মাদারগঞ্জে বিভিন্ন সমবায় সমিতিতে জমানো অর্থ ফেরতের দাবিতে গ্রাহকদের উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করে বিক্ষোভের ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা, হাতাহাতি ও কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা পরিস্থিতির জটিলতাকেই সামনে এনেছে। তবে এর পেছনে যে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ রয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জেলা সমবায় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারগঞ্জের ২৩টি সমবায় সমিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৩২ হাজার ৪২৪ জন গ্রাহকের প্রায় ৭২০ কোটি ১৯ লাখ টাকা আটকে থাকার তথ্য অত্যন্ত গুরুতর। এই অর্থের সঙ্গে শুধু হিসাবের সংখ্যা জড়িত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের সঞ্চয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পুঁজি, প্রবাসীর পাঠানো অর্থ, শ্রমজীবী মানুষের উপার্জন এবং চাকরিজীবীদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
এ অবস্থায় গ্রাহকদের ক্ষোভকে সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সংকট আড়ালে থেকে যাবে। আবার আমানত ফেরতের যৌক্তিক দাবির অজুহাতে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া, কাউকে অবরুদ্ধ করা কিংবা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়াও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ হতে পারে না। ন্যায়সংগত দাবি আদায়ের আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এত বিপুল অর্থ কীভাবে আটকে গেল এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন কী করেছে। কোনো সমবায় সমিতি নিয়ম লঙ্ঘন করলে, আমানত ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করলে বা গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে কোথায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে ঘাটতি ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এ সংকটের সমাধানে প্রথম প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আর্থিক হিসাব। কোন সমিতিতে কত টাকা জমা হয়েছে, কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, বর্তমানে কত টাকা সম্পদ রয়েছে, কত টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে এবং কার কাছে কী পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে, তা সমিতিভিত্তিক প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি গুজব ও বিভ্রান্তিও কমবে।
দ্বিতীয়ত, জেলা প্রশাসন, সমবায় বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গ্রাহক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর সমন্বয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। প্রতিটি সমিতির জন্য আলাদা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে উদ্ধারযোগ্য সম্পদ, দায়-দেনা এবং অর্থ ফেরতের বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ করা যেতে পারে। গ্রাহকদেরও জানাতে হবে, কোন পথে এবং কী প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
তৃতীয়ত, যেসব সমিতির সম্পদ রয়েছে কিন্তু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা বা অনিয়মের কারণে গ্রাহকরা অর্থ পাচ্ছেন না, সেসব সম্পদ শনাক্ত করে আইনানুগভাবে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর্থিক অনিয়ম বা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা, সম্পদ জব্দ বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যেন বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য সমবায় সমিতিগুলোর নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন, অডিট ও পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করে আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নযোগ্য, তার একটি লিখিত রূপরেখা থাকা দরকার। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় থাকা মানুষ এখন কথার চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান।

