একসময় যে নদীতে ছিল স্রোত, মাছ, নৌকা আর জীবনের ব্যস্ততা, সেই নদীর বুকেই এখন সবুজ ফসলের ক্ষেত। মাদারগঞ্জের ঝারকাটা নদীর বর্তমান চিত্র যেন একটি নদীর মৃত্যুর গল্প।
দৈনিক নতুন জামালপুরে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঝারকাটা নদীর করুণ বর্তমান। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর বিভিন্ন অংশ এখন পলি ও বালুতে ভরাট। কোথাও চর জেগেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে দিঘির মতো জলাশয়। নদীর বুকজুড়ে চাষ হচ্ছে ধান, মরিচ, গম, ভুট্টা, খেসারি ও মাসকলাই। বর্ষায় সামান্য পানি এলেও শুকনো মৌসুমে নদী যেন নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলে।
দীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সেতু নির্মাণ, দখল, দূষণ, বালু-পলি জমা এবং দীর্ঘদিন খনন না হওয়ার সম্মিলিত ফলেই ঝারকাটার এই দশা।
নদী মরে গেলে শুধু পানি হারায় না। হারায় মাছ, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য, নৌপথ, কৃষির স্বাভাবিক সেচব্যবস্থা এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা। প্রতিবেদনে শতাধিক জেলে পরিবারের জীবিকা সংকটে পড়ার যে তথ্য এসেছে, সেটি বিশেষভাবে উদ্বেগের। একটি নদীর নাব্যতা হারানোর অর্থ তাদের জন্য একটি প্রজন্মের পেশা হারানোরও নাম।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। নদী দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে শুধু নদী খননের উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। একদিকে নদী খনন করা হবে, অন্যদিকে যদি আবার দখল বা অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে সেই খনন দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না। নদী রক্ষায় তাই খননের পাশাপাশি নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্ত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ঝারকাটা নদীতে ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে। এটি আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু একটি প্রকল্প অনুমোদন হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। খননের আগে নদীর প্রকৃত প্রবাহ, পানি ধারণক্ষমতা ও সংযোগস্থল বিবেচনা করতে হবে। কোথায় কতটুকু খনন প্রয়োজন, বর্ষার পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং খননের পর নদী কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, তারও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
ঝারকাটা নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাদারগঞ্জের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং বহু মানুষের জীবন-জীবিকা। নদীকে আমরা কেবল বর্ষাকালের পানির ধারক হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা।
আজ নদীর বুকজুড়ে যে ফসলের সবুজ দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো চোখে সুন্দর। কিন্তু সেই সবুজের নিচে যদি চাপা পড়ে যায় একটি নদীর অস্তিত্ব, তবে ভবিষ্যতের হিসাবটি ভয়াবহ হতে পারে। নদী হারালে একদিন হয়তো এই জমিও তার স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা হারাবে। বদলে যেতে পারে এলাকার জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য।
তাই ঝারকাটাকে বাঁচানোর উদ্যোগ আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই। প্রস্তাব অনুমোদনের পর দ্রুত, পরিকল্পিত ও কার্যকর খনন করতে হবে। একই সঙ্গে নদীকে দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, খননের পর নদীটির নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা অবশ্যই করা প্রয়োজন।

