একটি দামি মোবাইল ফোনের জন্য একটি শিশুকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া, বাধা দেওয়ায় তাকে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যাওয়া শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি কঠিন প্রশ্নও বটে। প্রশ্নটি হলো, একজন কিশোর বা তরুণ কীভাবে এমন অপরাধ করার মানসিকতায় পৌঁছায়?
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দিতে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক। তবে একটি হত্যাকাণ্ডের পর শুধু হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? অপরাধের শাস্তি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধী তৈরির সামাজিক প্রক্রিয়াটিও বুঝতে হবে।
কিশোর গ্যাং শব্দটি এখন আমাদের সমাজে পরিচিত। কিন্তু শব্দটি যতটা পরিচিত, এর পেছনের বাস্তবতা নিয়ে আমাদের সামাজিক উদ্যোগ ততটা দৃশ্যমান নয়। পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ ঘোরাফেরা, উচ্ছৃঙ্খলতা, ইভটিজিং, মাদক, অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারি, চাঁদাবাজি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধকে বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ঘটনা হিসেবে শুরু হয়। সময়মতো প্রতিরোধ না হলে সেই ছোট ঘটনাই একদিন ভয়াবহ অপরাধে রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আমরা অনেক সময় এসব আচরণকে স্বাভাবিক করে ফেলি। ছেলে বাইরে কার সঙ্গে মিশছে, রাত কোথায় কাটাচ্ছে, হঠাৎ তার জীবনযাপনে কী পরিবর্তন এসেছে, পড়াশোনা বা কাজের প্রতি আগ্রহ কমছে কি না, মাদক বা অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে পরিবার কতটা খোঁজ রাখছে?
সন্তানের হাতে দামি ফোন তুলে দেওয়াই দায়িত্ব নয়। সে ফোনে কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে এবং তার অনলাইন আচরণ তার বাস্তব আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও অভিভাবকের জানা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ আর নজরদারি এক বিষয় নয়। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানা এবং ভুল আচরণের শুরুতেই সীমারেখা তৈরি করা পরিবারে দায়িত্বের অংশ।
তবে কিশোর অপরাধের দায় শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধুসমাজ, স্থানীয় পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রত্যেকটির সম্পর্ক রয়েছে।
স্কুল-কলেজে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মাপলে চলবে না। আচরণগত পরিবর্তন, সহিংস প্রবণতা, মাদকাসক্তির ঝুঁকি, মানসিক সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকেও নজর দিতে হবে। একইভাবে পাড়া-মহল্লায় অপরাধপ্রবণ কিশোরদের চিহ্নিত করে তাদের আরও অপরাধের দিকে ঠেলে না দিয়ে কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আর যারা ইতিমধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আইনকে কার্যকর হতে হবে। কিশোর হওয়ার অজুহাতে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি কিশোর অপরাধীকে শুধুই অপরাধী হিসেবে দেখেও সমস্যার সমাধান হবে না। আইন অনুযায়ী বিচার, পুনর্বাসন এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা একসঙ্গে প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপরাধের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক দিনের ক্ষোভের বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি হত্যাকাণ্ডের পর সবাই অপরাধীর শাস্তি দাবি করি। কিন্তু অপরাধী যখন আমাদের আশপাশে ছোট ছোট অন্যায় করতে শুরু করে, তখন আমরা কতজন প্রতিবাদ করি?
রাস্তায় একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা, দুর্বল কাউকে দলবেঁধে মারধর করা, মাদক সেবন, ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া, অপরাধের ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া কোনো ‘ছেলেমানুষি’ নয়। এগুলো ভবিষ্যৎ বড় অপরাধের সতর্কসংকেত হতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি মামলার বিষয় নয়। এটি আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেখানে পুলিশ, প্রশাসন কিংবা আদালতের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকেও নিজেদের ভূমিকা দেখতে হবে।
অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে, বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, পরবর্তী অপ্রতিমকে যেন একইভাবে হারাতে না হয়।
কারণ প্রতিটি অপরাধের পর আমরা যদি শুধু প্রশ্ন করি, ‘অপরাধী কে?’ তাহলে হয়তো একটি মামলার সমাধান হবে।
কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, ‘এই অপরাধী তৈরি হলো কীভাবে?’ তাহলে হয়তো একটি সমাজকে বাঁচানোর পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।

