জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও পাশের ধনবাড়ী উপজেলার সয়া বাজারে দুটি ঋণদান সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি গ্রাহকের প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সঞ্চয় সংগ্রহের পর সমিতির কার্যালয় বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গা ঢাকা দেওয়ার ঘটনায় বহু পরিবার এখন অনিশ্চয়তায়। কারও হয়তো সন্তানের পড়াশোনা, কারও চিকিৎসা, আবার কারও শেষ বয়সের অবলম্বন ছিল এই সঞ্চয়। সেই অর্থ হারিয়ে তাঁদের অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল? সমবায় সমিতির নিবন্ধন, কার্যক্রম পরিচালনা, আর্থিক লেনদেন ও নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি দপ্তরগুলো কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছে? একটি সমিতি রাতারাতি দুই হাজারের বেশি মানুষের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে এই কার্যক্রম চললে তার আর্থিক স্বচ্ছতা ও বৈধতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকার কথা। অথচ গ্রাহকদের অভিযোগের পরও যদি অনিয়ম শনাক্ত না হয়, তাহলে তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহের প্রবণতা নতুন নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকিং সেবার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সচেতনতার অভাব এবং দ্রুত মুনাফার প্রত্যাশাকে পুঁজি করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অনেক মানুষ প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা আমানতের নিরাপত্তা যাচাই না করেই সারা জীবনের সঞ্চয় জমা রাখেন। কিন্তু গ্রাহকদের অসচেতনতাকে দায়ী করে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। একটি নিবন্ধিত সমবায় সমিতি নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, সমিতি দুটির আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের হিসাব খুঁজে বের করা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন তদন্তের আওতায় আনতে হবে। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আইনসম্মতভাবে যাচাই করতে হবে। শুধু কার্যালয় বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ করলেই হবে না, অর্থ কোথায় গেল, কারা এর সুবিধাভোগী, সেটিও বের করতে হবে।
পাশাপাশি দুই সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও কার্যক্রমের বৈধতা খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তিদের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
মানুষের সঞ্চয় শুধু টাকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের শ্রম, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। সেই সঞ্চয় রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল প্রতারণার পর মামলা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রতারণা ঠেকাতে আগাম নজরদারি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরিষাবাড়ী ও ধনবাড়ীর এই ঘটনা যেন আরেকটি দীর্ঘ বিচারহীনতার উদাহরণ হয়ে না থাকে।

