১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত সরিষাবাড়ী পৌরসভা ২০২৪ সালে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায়। ২১ দশমিক ১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডে বসবাস করেন ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। এত বড় জনপদের প্রতিদিনের গৃহস্থালি ও বাজারের বর্জ্য কোথায় যাবে, কীভাবে সংগ্রহ হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, তা পৌরসভার পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে সেই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে, বাজারের পাশে, সড়কের ধারে ও জলাশয়ে। এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, নাগরিক দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতারও পরিচয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই সংকট সরাসরি আঘাত হানছে ঝিনাই ও সূবর্ণখালী নদীর ওপর। ঝিনাই নদীর তীরে বর্জ্যের স্তূপ গড়ে উঠছে। অন্যদিকে শিমলা ও আরামনগর বাজারের নালা থেকে দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে সূবর্ণখালী নদীতে। নদী দুটি এই অঞ্চলের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ সেগুলোই পরিণত হচ্ছে বর্জ্য ফেলার অনানুষ্ঠানিক ভাগাড়ে। নদীর পানিতে বর্জ্য মিশলে শুধু পানির গুণগত মান নষ্ট হয় না, জলজ প্রাণী, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নদী দখল ও দূষণ এমনিতেই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। তার সঙ্গে যখন স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। নাগরিকদের কাছ থেকে কর ও বিভিন্ন ফি নেওয়ার অন্যতম যৌক্তিকতা হলো প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। অথচ সেই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানই যদি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে, তবে জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসবেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কোনোভাবেই পরিবেশদূষণের দায় এড়ানোর ঢাল হতে পারে না।
এই অব্যবস্থাপনার প্রভাব পৌরবাসীকে প্রতিদিন ভোগ করতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া, নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া, দুর্গন্ধে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়া এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাজার ও আবাসিক এলাকার পাশে জমে থাকা বর্জ্য মাছি-মশার বিস্তার এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের জন্য এর ঝুঁকি বেশি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানে শুধু ময়লা সংগ্রহ করে লোকচক্ষুর আড়ালে ফেলে দেওয়া নয়। একটি কার্যকর ব্যবস্থায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, পুনর্ব্যবহার, জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হয়। স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনও হতে হবে পরিবেশগত ও কারিগরি বিবেচনায় উপযুক্ত স্থানে, যাতে তা নতুন কোনো দূষণকেন্দ্রে পরিণত না হয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত জনবল, নির্ধারিত সংগ্রহসূচি এবং নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ।
অবিলম্বে নদীর তীর ও জনসমাগমস্থলে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। ইতিমধ্যে জমে থাকা বর্জ্য নিরাপদভাবে অপসারণ, নালা পরিষ্কার এবং দূষিত পানি নদীতে পড়া কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ঝিনাই ও সূবর্ণখালী নদীর দূষণের উৎস চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিবেশগত পরীক্ষা এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো জরুরি।

