Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

দাঙ্গার আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকছে ফরাসি সরকার

দাঙ্গার আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকছে ফরাসি সরকার

রোখায়া দেয়ালো ।। ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ভাঙচুর করা দোকানপাট, সম্পদ ধ্বংস, লুটপাট ও আগুনের লেলিহান শিখা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। এসব সহিংসতার নিন্দা ও প্রতিবাদ অবশ্যই যৌক্তিক।

তবে এসব ঘটনার পেছনে থাকা মানুষের উদ্দেশ্যকে একভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লুটপাট ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে কিছু সুযোগসন্ধানী অপরাধী। কিন্তু এর পাশাপাশি রয়েছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়েছে। বছরের পর বছর জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটেছে, অথচ মানুষের পরিবর্তনের দাবি উপেক্ষিত থেকেছে।

ফরাসি সরকার এই সহিংসতাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত নিরাপত্তানির্ভর পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে এবং নিজেদের ব্যর্থতার জন্য জনসমালোচনা এড়াতে সরকার দাঙ্গার ঘটনাগুলোকে সামনে আনছে। বিশৃঙ্খলার দৃশ্য দেখিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন তারাই জনশৃঙ্খলার একমাত্র রক্ষক। অথচ তাদের নীতিই জনশৃঙ্খলার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

কিন্তু এসব সহিংসতা ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের ন্যায্যতাকে খারিজ করতে পারে না। একইভাবে, বিক্ষোভের আড়ালে পুলিশের যে নির্মম সহিংসতা ঘটেছে, তা থেকেও মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডে চোয়াল ভেঙে গেছে ১৪ বছর বয়সী ইডেনের। তার কয়েকটি দাঁতও পড়ে গেছে। পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে ১৬ বছর বয়সী মায়েল একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডে ১৫ বছর বয়সী ইভানের একটি হাত উড়ে গেছে।

সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৫০ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তাদের ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর আরও ২ হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়। গতকালও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে আরও এক হাজার মানুষকে।

বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা এবং হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের এই ব্যাপকতা একুশ শতকের অন্যতম কঠোরভাবে দমন করা প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর একটি হিসেবে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করছে।

তবে সহিংসতার বাইরেও রয়েছে আরেক ধরনের নীরব সহিংসতা, যার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করছেন। সেটি হলো সামাজিক বঞ্চনা। অথচ জনপরিসরে চলমান আলোচনা ও সংবাদ পরিবেশনায় এই সংকট অনেকটাই উপেক্ষিত।

ফ্রান্সজুড়ে মানুষের মধ্যে দারিদ্র্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দেশটিতে দারিদ্র্যের হার ১৯৯০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন ৯৮ লাখ মানুষ। অন্যদিকে অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৫৩ জন ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মোট সম্পদের সমান।

আর্থসামাজিক অবস্থার এই অবনতি ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থাকেও গভীর সংকটে ফেলেছে।

মায়োত দ্বীপের আকুয়া এলাকায় সিতে দ্যু নর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত ৩১ আগস্ট থেকেই অবরোধ শুরু হয়েছিল। প্যারিস অঞ্চলে বিক্ষোভ আলোচনায় আসার অনেক আগে থেকেই সেখানকার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মীরা উন্নত শিক্ষা ও পাঠদানের পরিবেশের দাবিতে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন।

৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য নির্মিত বিদ্যালয়টিতে গাদাগাদি করে পড়াশোনা করছে ২ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়টিতে পানির সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। শৌচাগারগুলোর অবস্থাও অস্বাস্থ্যকর।

প্যারিসের উপকণ্ঠ সেভরঁ এলাকার ব্লেইজ-সঁদ্রার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ২০২৪ সাল থেকেই ভবনে পানির চুইয়ে পড়া, দেয়ালে ছত্রাক, ব্যবহারের অনুপযোগী শৌচাগার এবং টেবিল-চেয়ারের সংকট নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন।

প্যারিসের আরেক উপশহর প্যাঁতাঁর মার্সেলাঁ-বের্তেলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জানালাগুলো আর খোলা যায় না। অথচ তাপপ্রবাহের সময় সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।

একই অঞ্চলের বাগনোলের পলিৎসার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের পানি পান করার উপযোগী নয়। অথচ জুন মাসেই পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবনতির চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র এলাকাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই সংকটে বেশি ভুগছে।

শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত অর্থে কতটা শিক্ষা পাচ্ছে, সেই মানও কমে যাচ্ছে। ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে মায়োত বাদে দেশটির সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নির্ধারিত পাঠদানের ২ কোটি ২০ লাখ ঘণ্টার বেশি সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ নির্ধারিত পাঠদানের প্রায় প্রতি ১০ ঘণ্টার মধ্যে একটি ঘণ্টা শিক্ষার্থীরা পায়নি। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে অন্য শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায়।

ফরাসি অর্থনীতিবিদ লুকাস শঁসেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এমানুয়েল মাখোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি ব্যয় ২০ শতাংশ কমেছে।

ফরাসি শিক্ষার্থীরা মূলত এই কাঠামোগত অবিচারের অবসান চাইছেন। কিন্তু তাদের কথা শোনার পরিবর্তে সরকার বেছে নিয়েছে দমন-পীড়ন এবং পরিস্থিতিকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার কৌশল।

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের অবস্থান বুঝতে পারছেন। কিন্তু পুলিশের প্রতি যেভাবে সমর্থন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি তেমন সমর্থন প্রকাশ করেননি। শুক্রবার ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে বৈঠক করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো পূরণের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

বরং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অবস্থান আরও কঠোর করেছেন মাখোঁ। তিনি ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছেন এবং বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, ‘চরম বামপন্থীরা’ প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটাতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও বামপন্থীদের একধরনের পক্ষ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, একদিকে পুলিশকে সমর্থন করে প্রজাতন্ত্রের পক্ষে থাকা, অন্যদিকে দাঙ্গাকারী ও তাদের ‘সহিংস কর্মসূচির’ পাশে দাঁড়ানো। যেন প্রতিবাদে অংশ নেওয়াই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ।

এদিকে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিচ্ছে চরম ডানপন্থীরা। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সম্ভাব্য জাতিগত উৎস নিয়ে বিতর্ক সামনে এনে তারা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দাবিগুলো আড়াল করছে। চরম ডানপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক সহিংসতায় জড়িতদের ‘বিদেশি বংশোদ্ভূত দুর্বৃত্তদের দল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আরও বাড়ানোরও দাবি তুলেছেন।

এই বক্তব্য মাখোঁর রাজনৈতিক শিবিরের জন্যও সুবিধাজনক। কারণ, এর মাধ্যমে তারা নিজেদের আবারও চরম ডানপন্থার বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। জনগণকে সরকারের শাসন ও নীতির মূল্যায়নের ভিত্তিতে নয়, বরং ভয় থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো যায়।

ফলে ভোটারদের সামনে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে পছন্দের সুযোগ। একদিকে এমন রাজনৈতিক শক্তি, যারা মানুষের ক্ষোভের পেছনে থাকা সংকটগুলো তৈরি করেছে বা বাড়তে দিয়েছে; অন্যদিকে এমন শক্তি, যারা সেই ক্ষোভকে জাতিগত বিদ্বেষে রূপ দিতে চায়।

এখন স্পষ্ট, শিক্ষার্থীদের দাবি সত্যিকার অর্থে পূরণ করার আগ্রহ সরকারের মধ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এসব দাবি মেনে নেওয়ার অর্থ হবে মাখোঁর শাসনামলের মূল অগ্রাধিকারগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলা। অর্থাৎ অল্পসংখ্যক ধনীর সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করার নীতির মুখোমুখি হওয়া।

এর পরিবর্তে সরকার অপেক্ষা করবে আন্দোলনটি কখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ভয়ভীতিতে দুর্বল হয়ে যায় কিংবা সহিংসতার কারণে জনসমর্থন হারিয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনটি যেন নিজে থেকেই নিভে যায়, সেটিই হবে সরকারের কৌশল।

কিন্তু এই কৌশল যে ব্যর্থ হবে, তা বোঝার জন্য খুব বেশি দূরদৃষ্টি প্রয়োজন নেই। বর্তমান আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলেও অচিরেই নতুন কোনো আন্দোলন গড়ে উঠবে। কারণ, মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত খারাপ হতে থাকলে ফরাসি জনগণকে অনির্দিষ্টকাল ভয় দেখিয়ে নিষ্ক্রিয় রাখা সম্ভব নয়।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies