Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

খাদ্য লাইসেন্স যেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের গলার কাঁটা না হয়

খাদ্য লাইসেন্স যেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের গলার কাঁটা না হয়

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে অপরিহার্য। মানুষের খাবার নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর আইন ও তদারকিরও প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বিধান তৈরি কিংবা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার ওপর নয়, বরং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি কতটা সহজ, স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাবান্ধব, তার ওপর। নিরাপদ খাদ্যের নামে নতুন কোনো প্রশাসনিক জটিলতা যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

নতুন প্রবিধানমালার আওতায় রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, পিঠা-পুরি-পেঁয়াজু বিক্রেতা, ছোট রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত শ্রেণি অনুযায়ী নিবন্ধন অথবা লাইসেন্স নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ, খাদ্যদূষণ কিংবা অনিরাপদ উপকরণ ব্যবহারের ঝুঁকি শুধু বড় কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে প্যাকেটজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সব খাদ্য ব্যবসার ধরন, আর্থিক সামর্থ্য, অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থা এক নয়। বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ফুটপাতের একটি ছোট খাবারের দোকানকে একই প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি করা হলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ধরনের নথিপত্র, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে তা বহন করা কঠিন হতে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য অভিন্ন হলেও বিধান বাস্তবায়নে ব্যবসার ধরন ও সক্ষমতা বিবেচনায় আনতে হবে।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। নিবন্ধন ও লাইসেন্স কি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার অংশীদার করবে, নাকি অতিরিক্ত নিয়মকানুনের চাপে তাদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শহর কিংবা গ্রাম, হাটবাজার কিংবা বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ কিংবা গ্রামের ছোট বাজার, সর্বত্র অসংখ্য মানুষ খাবার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এসব ছোট উদ্যোগের ওপর। কেউ নিজে খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দোকান চালান, আবার কেউ অল্প পুঁজি নিয়ে ভ্রাম্যমাণ দোকানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব উদ্যোক্তার অনেকেরই ব্যবসায়িক পরামর্শক, হিসাবরক্ষক কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির আলাদা ব্যবস্থা নেই।

তাঁদের সামনে যদি জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া, অস্পষ্ট শর্ত, একাধিক দপ্তরে যাতায়াত কিংবা অপ্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, তাহলে নিবন্ধন একটি ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীর শরণাপন্ন হতে পারেন। এতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার নিয়ম না বুঝতে পেরে কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে বিধি লঙ্ঘন করতে পারেন। এর পরিণতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার যে উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিই ব্যাহত হতে পারে।

এ কারণে প্রথমেই নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। কোন ব্যবসার জন্য শুধু নিবন্ধন প্রয়োজন, কোনটির জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, কত টাকা ফি দিতে হবে এবং কত দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে, এসব তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। সরকারি গেজেটের ভাষা সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে সব সময় সহজবোধ্য নাও হতে পারে। তাই প্রবিধানমালার সারসংক্ষেপ, আবেদন নির্দেশিকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক নির্দেশনা তৈরি করে তা বাজার, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে।

স্বচ্ছতার পাশাপাশি আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে এবং ধাপে ধাপে শতভাগ অনলাইন আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে আবেদনকারীদের যাতায়াত কমতে পারে, নথিপত্র জমা দেওয়া সহজ হতে পারে এবং আবেদনের অগ্রগতি জানার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে অনলাইন আবেদনই যেন নতুন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

দেশের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সীমিত, কারও ইন্টারনেট সংযোগ নিয়মিত নয়, আবার কেউ অনলাইনে ফরম পূরণ করতে স্বচ্ছন্দ নন। তাঁদের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সহায়তা কেন্দ্র, নির্দিষ্ট হেল্পলাইন এবং সরাসরি পরামর্শের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। যাঁরা নিজেরা অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন না, তাঁরা যেন সরকারি সহায়তায় আবেদন সম্পন্ন করতে পারেন। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্য হবে মানুষের কাজ সহজ করা, নতুন করে কাউকে বাদ দেওয়া নয়।

ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি প্রয়োজন। প্রবিধানমালার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথম নিবন্ধন বিনামূল্যে করার বিধান রয়েছে। এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে যেসব ব্যবসার জন্য লাইসেন্স ফি প্রযোজ্য, সেখানে ব্যবসার আকার, উৎপাদনক্ষমতা, ঝুঁকি ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনাকারীর বাস্তবতা এক নয়। ফি ও শর্ত এমন হতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, কিন্তু অযৌক্তিক ব্যয়ের বোঝা তৈরি না হয়।

একই সঙ্গে ফি-সংক্রান্ত সব তথ্য প্রকাশ্যে থাকা জরুরি। আবেদন, পরিদর্শন, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে কোন সেবার জন্য কত টাকা দিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ দাবি, আবেদন আটকে রেখে হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। আবেদন গ্রহণের পর রসিদ, আবেদন নম্বর, নিষ্পত্তির সম্ভাব্য সময় এবং প্রত্যাখ্যাত হলে তার লিখিত কারণ জানানো নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে প্রমাণ করতে হবে, লাইসেন্স ব্যবস্থা জনস্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু নিবন্ধন সনদ হাতে তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকৃত প্রয়োজন হলো খাবার তৈরির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, নিরাপদ পানি ব্যবহার, কাঁচা ও রান্না করা খাবার যথাযথভাবে সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার পরিবেশন এবং ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার বন্ধ করা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। হাত ধোয়া, পরিষ্কার পানির ব্যবহার, খাবার ঢেকে রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ সংরক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো শেখানোর মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies