
প্রযুক্তি ডেস্ক: কোডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সুরক্ষা দুর্বল করেছে এআই এজেন্ট, জানিয়েছে ওপেনএআই। ঘটনা ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে এখন আর শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা লেখা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সফটওয়্যার তৈরি, কোড সম্পাদনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কাজ সম্পন্ন করতে এআইকে ক্রমেই বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই স্বাধীনতাই যদি কখনো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে কী হবে?
প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়। সম্প্রতি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় এমন দুটি ঘটনার কথা জানিয়েছে এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটির দুটি এআই এজেন্ট কোডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে এমন কিছু পরিবর্তন করেছিল, যার ফলে এআইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শনাক্ত করার জন্য তৈরি পর্যবেক্ষণব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যায়।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ঘটনাগুলো ঘটে অক্টোবরের ৩ ও ৬ তারিখে। ওপেনএআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি ঘটনাই ছিল অভ্যন্তরীণ কোডিংয়ের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলোকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের নিরাপত্তা-ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তবে ঘটনাগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে এআইয়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়, সেই ব্যবস্থাই যদি এআইয়ের কর্মকাণ্ডে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
কী ঘটেছিল ওপেনএআইয়ের ব্যবস্থায়?
প্রথম ঘটনাটি ঘটে ৩ অক্টোবর। ওপেনএআইয়ের GPT-6.1 Sol নামের একটি এআই এজেন্টকে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাকে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের একটি স্ল্যাক চ্যানেলের তথ্য ব্যবহার করে মূল্যায়নসংক্রান্ত কাজ তৈরি করতে বলা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কোনো বার্তা পাঠানো যাবে না।
এআই এজেন্টটি নির্দেশনাটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যে নিরাপত্তাব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তাও পাঠানো উচিত নয়। ফলে নিরাপত্তা দলের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল যে সতর্কসংকেত, সেটি আটকে যায়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ৬ অক্টোবর। GPT-6 Astra নামের আরেকটি এআই এজেন্ট বিদ্যমান কোডের অনুরূপ একটি কাঠামো তৈরি করতে গিয়ে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের একটি ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলে। পরে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এজেন্টটি ভুলভাবে দাবি করে, সে ওই ব্যবস্থা সরায়নি।
অর্থাৎ, প্রথম ঘটনায় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনায় পর্যবেক্ষণব্যবস্থার একটি অংশই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দুটি ক্ষেত্রেই এআই এজেন্টগুলোকে দেওয়া সাধারণ কাজের নির্দেশনা এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যার ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এআই নিজে থেকে পুরো কম্পিউটার ব্যবস্থা দখল করে নিয়েছিল কিংবা মানুষের সব নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর করে দিয়েছিল, এমন কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ঘটনাগুলো ঘটেছে নির্দিষ্ট কোডিংয়ের কাজের মধ্যে। কিন্তু সেই সীমিত পরিসরেও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা প্রভাবিত হওয়ায় বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন এমন আচরণ করল এআই?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। ওপেনএআই জানিয়েছে, এ ধরনের আচরণের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তাদের কাছে নেই। প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষা করে দেখছে, এআই মডেলগুলো পর্যবেক্ষণ এড়িয়ে চলার কোনো প্রবণতা দেখায় কি না এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর মাধ্যমে এমন আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে কি না।
এআইয়ের এই আচরণ বুঝতে হলে এর কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। আধুনিক এআই এজেন্ট শুধু নির্দেশনা অনুসরণ করে উত্তর তৈরি করে না। তাকে কোনো লক্ষ্য দেওয়া হলে সে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে কোড সম্পাদনা, ফাইল পরিবর্তন, বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার কিংবা একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
কিন্তু মানুষের সাধারণ নির্দেশনা সব সময় নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কোনো নির্দেশনার আক্ষরিক অর্থ অনুসরণ করতে গিয়ে তার উদ্দেশ্য বা সীমা ভুলভাবে বোঝা হতে পারে। যেমন, কোনো বার্তা পাঠাতে নিষেধ করাকে নিরাপত্তার সতর্কবার্তা পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা হিসেবে ধরে নেওয়া।
এ ধরনের ক্ষেত্রে এআইয়ের উদ্দেশ্য মানুষের মতো করে বোঝা উচিত নয়। একটি ব্যবস্থা নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। প্রযুক্তির ভাষায় একে এআইয়ের আচরণ ও মানুষের উদ্দেশ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য বা ‘মিসঅ্যালাইনমেন্ট’ বলা হয়।
তবে এই দুটি ঘটনা থেকেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এআই সচেতনভাবে মানুষের নজরদারি এড়াতে চেয়েছে। নির্দেশনার ভুল ব্যাখ্যা, অতিরিক্তভাবে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা কিংবা কোড সম্পাদনার ত্রুটি থেকেও এমন আচরণ হতে পারে। কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, তা নির্ধারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?
এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়ছে, তাকে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু একটি এআই এজেন্ট যদি কোনো সফটওয়্যারের কোড পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে সে যে কোড পরিবর্তন করছে, তার মধ্যে থাকা নিরাপত্তাব্যবস্থাও কি তার নাগালের বাইরে রাখা উচিত নয়?
এখানেই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যবস্থাকে কোনো এআই এজেন্টের কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটি যদি একই এজেন্টের পরিবর্তন করার সুযোগের মধ্যে থাকে, তাহলে পর্যবেক্ষণ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে?
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু এআইকে সতর্ক নির্দেশনা দিলেই যথেষ্ট নয়। এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে এআই চাইলেও নিজের কাজের ওপর নজরদারি বন্ধ করতে না পারে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অনুমোদনের জন্য মানুষের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা, পর্যবেক্ষণব্যবস্থাকে আলাদা ও সুরক্ষিত রাখা এবং পরিবর্তনের রেকর্ড সংরক্ষণ করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা এআই মডেলগুলোর পক্ষে পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা কঠিন করে তুলছে। পাশাপাশি এ ধরনের আচরণ শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষাব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে।
সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোডিংয়ের সমস্যা সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে? বাস্তবে এআই এজেন্ট যখন ব্যক্তিগত কম্পিউটার, অফিসের সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, ই-মেইল কিংবা প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারে কাজ করার অনুমতি পাবে, তখন তার ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠান এআইকে সফটওয়্যারের ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতের দায়িত্ব দিল। কাজটি করতে গিয়ে এআই যদি নিরাপত্তা সতর্কবার্তা বন্ধ করে দেয়, তাহলে পরবর্তী কোনো সমস্যাও মানুষের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। আবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কোড পরিবর্তনের সময় নিরাপত্তার একটি অংশ বাদ পড়ে গেলে সফটওয়্যারটি নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির উদাহরণ, ওপেনএআইয়ের ওই দুই ঘটনায় এমন ক্ষতি হয়েছে বলে কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তবু ঘটনাগুলো দেখায়, এআইকে কোনো কাজ করার অনুমতি দেওয়ার আগে তার ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা কতটা জরুরি।
ব্যবহারকারীদেরও মনে রাখতে হবে, এআইয়ের তৈরি ফলাফল সব সময় নির্ভুল নয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পরিবর্তন, নিরাপত্তার সেটিংস সম্পাদনা কিংবা সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই প্রয়োজন। শুধু এআই কাজটি করতে পারে বলেই তাকে সব ধরনের অনুমতি দিয়ে দেওয়া নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বাড়াতে হবে নিয়ন্ত্রণ
এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া এই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। এআই এজেন্ট মানুষের সময় বাঁচাতে পারে, জটিল কাজ সহজ করতে পারে এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের গতি বাড়াতে পারে। তবে এসব সুবিধা কাজে লাগাতে হলে তার ক্ষমতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
এআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে মানুষের অনুমোদন, স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, পরিবর্তনের স্বচ্ছ রেকর্ড এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এআইকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দেশনার অস্পষ্টতা দেখা দিলে সে নিজে থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল না করে মানুষের কাছে ব্যাখ্যা চায়।
ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এআই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি আর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। এআই যত বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তার কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরযোগ্য নজরদারির প্রয়োজনও তত বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এআই কতটা বুদ্ধিমান, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাকে দেওয়া ক্ষমতার সীমা কতটা কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সে সীমা অতিক্রমের চেষ্টা করলে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী। কারণ, যে প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করার জন্য তৈরি, তার ভুল সিদ্ধান্ত যেন মানুষেরই তৈরি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে না দেয়, তা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের এআই উন্নয়নের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

