বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ১১ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে প্রয়োজন পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও মজুত নিয়ে অনিশ্চয়তা, তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। এই বাস্তবতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
রূপপুরের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের বড় সুবিধা হলো, এটি দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ রয়েছে। তবে পারমাণবিক জ্বালানিও আমদানিনির্ভর। কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা, নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও রয়েছে। তাই একে জ্বালানি সংকটের একমাত্র সমাধান ভাবার সুযোগ নেই।
রূপপুর প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, দক্ষ জনবল, কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তাড়নায় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়, উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্য এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য জানাতে হবে।
বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জ্বালানির একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের সমন্বয় ঘটানোই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার কার্যকর পথ।
রূপপুরে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি। এখন প্রয়োজন এই অর্জনকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহে রূপ দেওয়া। তেল-গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় পারমাণবিক বিদ্যুতে মনোযোগ বাড়ুক, তবে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কঠোর নিরাপত্তা, আর্থিক জবাবদিহি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সমন্বয়ে।

