জামালপুর শহরের বোসপাড়া। এখন এখানে বাড়িঘর, সড়ক, দোকানপাট আর মানুষের কোলাহল। অথচ একসময় এই এলাকাতেই ছিল প্রায় ৪৫ বিঘা জমির এক বিস্ময়কর সবুজ জগৎ। নাম চৈতন্য নার্সারি ও ফোরটাঙ্কস গার্ডেন।
একজন আইনজীবী নিজের অর্থ ও শ্রমে গড়ে তুলেছিলেন সেই উদ্যান। দেশি গাছের পাশাপাশি দূরদেশের ফুল, ফল, লতা, গুল্ম ও বৃক্ষ এনে তিনি জামালপুরের মাটিতে সেগুলোর চাষের চেষ্টা করেছিলেন। ছিল জলাধার, আঁকাবাঁকা পথ, কৃত্রিম পাহাড়, সিডবেড ও গ্রিনহাউস। উদ্ভিদ সংগ্রহ ও পরীক্ষার এমন উদ্যোগ উনিশ শতকের শেষভাগের মফস্বল জামালপুরের জন্য যে ব্যতিক্রমী ছিল, স্থানীয় ইতিহাসের নানা বর্ণনাতেই তার ইঙ্গিত মেলে।
সেই মানুষটির নাম ঈশ্বরচন্দ্র গুহ।
আজ তাঁর নার্সারি নেই। নেই সেই বিশাল উদ্যানও। ৪৫ বিঘার জায়গা গিলে নিয়েছে শহরায়ণ। পড়ে আছে শুধু কয়েকটি পুরোনো গাছ আর হারিয়ে যাওয়া এক ইতিহাসের টুকরো টুকরো স্মৃতি।
১৮৮৪ সালের দিকে চৈতন্য নার্সারির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে। প্রায় এক দশকের চাষ, সংগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৮৯৪ সালের দিকে এর বিস্তৃতি পূর্ণতা পেয়েছিল বলে এসব লেখায় দাবি করা হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র গুহ কৃষিবিজ্ঞান বা উদ্ভিদবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, এমন নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত নথি সহজলভ্য নয়। কিন্তু উদ্ভিদ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিদেশি বীজ-চারা সংগ্রহ এবং নার্সারি পরিচালনার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। কেবল গাছ লাগানো নয়, কোন উদ্ভিদ কোথা থেকে এলো, এ দেশের মাটিতে কীভাবে বেড়ে ওঠে, কোন পরিবেশে টিকে থাকে, এসব নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল বলে এসব বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
চৈতন্য নার্সারির ব্যাপ্তির সবচেয়ে আলোচিত প্রমাণ একটি পুরোনো ক্যাটালগের উল্লেখ। বিভিন্ন প্রকাশিত লেখায় বলা হয়েছে, সেখানে ৪ হাজার ৬৬৮ ধরনের ফুল, ফল, লতা, গুল্ম ও বৃক্ষের নাম ছিল। ছিল দেশি নাম, বৈজ্ঞানিক নাম এবং মূল্যতালিকার কথাও। তবে মূল ক্যাটালগটি এখন কোথায়, তার নিশ্চিত সন্ধান প্রয়োজন। সংখ্যাটিও মূল নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি। কারণ, এই একটি দলিল উদ্ধার করতে পারলে চৈতন্য নার্সারির প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে ইতিহাসের সামনে নতুন দরজা খুলতে পারে।
ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বীজ ও চারা সংগ্রহের কথা স্থানীয় ইতিহাসে রয়েছে। জাপান থেকে মাটি এনে স্থানীয় মাটির সঙ্গে তুলনা করে পরীক্ষা করার কথাও বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।
অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান ক্যামফর গাছ চাষের চেষ্টার কথাও উল্লেখ আছে। ফোরটাঙ্কস গার্ডেনে ছিল ফুল ও ফলের বাগান, জলজ উদ্ভিদের অংশ, বীজ উৎপাদনের সিডবেড এবং শোভাবর্ধক উদ্ভিদের সংগ্রহ। গ্রিনহাউসে অর্কিড, ফার্নসহ বিদেশি উদ্ভিদ চাষ করা হতো। শত শত অর্কিড ও ফার্ন এবং প্রায় ৭০০ জাতের গোলাপগাছ ছিল।
চৈতন্য নার্সারির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গল্প আরও বিস্ময়কর। বিভিন্ন লেখায় নার্সারির টেলিগ্রাফিক ঠিকানা হিসেবে “BOTANICHEN, JAMALPORE”-এর উল্লেখ রয়েছে। বিদেশ থেকে বীজ-চারা আসত, আবার এখান থেকেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশে উদ্ভিদসামগ্রী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও মরিশাসের উদ্যান বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের দাবিও পাওয়া যায়।
তবে এসব দাবির পক্ষে পুরোনো চিঠি, ক্যাটালগ, টেলিগ্রাম বা সরকারি নথি উদ্ধার করা গেলে ইতিহাসটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্যভাবে লেখা সম্ভব হবে।
চৈতন্য নার্সারির সঙ্গে ঢাকার কয়েকটি ঐতিহাসিক বৃক্ষের সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন প্রকাশিত বর্ণনায় পাওয়া যায়। ১৩২২ বঙ্গাব্দে ঢাকার তাঁতীবাজারে নার্সারিটির একটি শাখা খোলার কথা ছিল। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক ও কার্জন হলের কিছু রয়্যাল পাম চৈতন্য নার্সারি থেকে নেওয়া হয়েছিল।
১৯১৭ সালে বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর লর্ড রোনাল্ডস চৈতন্য নার্সারি পরিদর্শন করেছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র গুহ ১৯২৩ সালে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান।
এরপর নার্সারির পরিচর্যা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ধীরে ধীরে বিশাল উদ্যানটি হারিয়ে যায়। জমির ব্যবহার বদলায়। বাড়িঘর, সড়ক ও নগর স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে যায় ৪৫ বিঘার সবুজ পৃথিবী। সময়, অবহেলা ও নগরায়ণের কাছে ধীরে ধীরে হার মানে এই উদ্যান।
২০০৭ সালে সেখানে ছয়টি পামগাছ ও একটি বড় গর্জনগাছ দেখা গিয়েছিল বলে প্রত্যক্ষ বর্ণনা রয়েছে। পরে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেই গর্জনগাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে গাছটির নাম ছিল ‘লম্বা গাছ’। লম্বা গর্জনগাছটির নামানুসারে এলাকাটি ‘লম্বা গাছ’ নামে পরিচিতি পায়। এখনও কয়েকটি রয়্যাল পাম টিকে আছে। এই গাছগুলোর বয়স নির্ণয় এবং চৈতন্য নার্সারির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিশ্চিত করা গেলে এগুলো হয়ে উঠতে পারে জামালপুরের হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদ-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত নিদর্শন।
পুরোনো নার্সারির জমি ফিরিয়ে আনা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু ইতিহাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়।
অবশিষ্ট গাছগুলো চিহ্নিত করা যায়। সংরক্ষণ করা যায়। স্থাপন করা যায় একটি স্মারকফলক। সম্ভব হলে গড়ে তোলা যায় ছোট একটি ‘চৈতন্য স্মৃতি উদ্যান’।
সেখানে থাকতে পারে ঈশ্বরচন্দ্র গুহের জীবন, পুরোনো ক্যাটালগ, নার্সারির ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদসম্ভারের তথ্য।
কারণ, একটি শহরের ইতিহাস শুধু পুরোনো ভবনে থাকে না। কখনো কখনো কয়েকটি গাছও হয়ে ওঠে একটি যুগের শেষ দলিল। জামালপুরের চৈতন্য নার্সারি আজ নেই। ফোরটাঙ্কস গার্ডেনও নেই। ৪৫ বিঘার সেই সবুজ পৃথিবীও নেই। আছে কয়েকটি গাছ, কিছু পুরোনো লেখা আর মানুষের স্মৃতি। এখন প্রয়োজন সেই স্মৃতিকে গল্প হিসেবে নয়, দলিল হিসেবে উদ্ধার করা।

