আমন মৌসুমের মাঝপথে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কৃষকের জন্য কেবল একটি অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় নয়, এটি কৃষি উৎপাদনের পুরো হিসাবকেই নতুন করে কঠিন করে তুলেছে। জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এর সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে আমন চাষিদের মধ্যে। ডিজেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে সেচের খরচ। বাড়তি ব্যয় সামলাতে অনেক কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে পারছেন না। কোথাও কোথাও পানির অভাবে জমির মাটি ফেটে যাচ্ছে। সময়মতো পানি না পেলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলায় বিপুল আমনের চাষ হয়েছে। এত বিপুল কৃষিজমি উৎপাদনের সঙ্গে সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় সরাসরি যুক্ত। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সেচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই এর অভিঘাত পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়বে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। একজন কৃষক যখন জমিতে ধান উৎপাদন করেন, তখন তিনি শুধু নিজের শ্রম ও জমির হিসাব করেন না। সেচের পানি, ডিজেল, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ প্রতিটি খরচ তাঁর উৎপাদন ব্যয়ের অংশ। এসব ব্যয় বাড়তে থাকলে কৃষকের ঝুঁকিও বাড়ে।
কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয় কতটা সহনীয় রাখা যাচ্ছে এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য কৃষক পাচ্ছেন কি না, সেটিও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
বিশেষ করে মৌসুমের মাঝপথে জ্বালানির দাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কৃষকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ কৃষক আগেই উৎপাদনের পরিকল্পনা ও ব্যয় নির্ধারণ করে জমিতে নামেন। মাঝপথে বড় ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি তাঁর সেই হিসাবকে বদলে দেয়। ফলে কৃষি নীতিতে জ্বালানি মূল্য, সেচব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্যের বাজারমূল্যের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হলেও সব এলাকায় বিকল্প সেচব্যবস্থা সমানভাবে সহজলভ্য নয়। আধুনিক ও জ্বালানিসাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তির প্রসার, সৌরশক্তিনির্ভর সেচ, ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সমবায়ভিত্তিক সেচব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু কৃষকদের কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি তাঁদের নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
একই সঙ্গে কৃষি উপকরণ পরিবহন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু সেচ নয়, সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ পরিবহনের খরচও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় কৃষকের ঘাড়েই পড়ে। তাই কৃষির জন্য জ্বালানি ও পরিবহন নীতিতে আলাদা করে প্রভাব মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
কৃষকের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন নীতির পূর্বানুমেয়তা। কোন মৌসুমে জ্বালানির দাম কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, কৃষি উপকরণের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি কী থাকবে এবং উৎপাদিত ফসলের বাজার ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের একটি স্পষ্ট ও সমন্বিত নীতি থাকা দরকার। আকস্মিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কৃষক যেন উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য না হন, সেটিও দেখতে হবে।
কারণ কৃষি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত জীবিকার বিষয় নয়। খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একজন কৃষক বাড়তি ব্যয়ের কারণে যদি প্রয়োজনীয় সেচ দিতে না পারেন, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শুধু একটি জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ, খাদ্যের দাম এবং ভোক্তার ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষকের কাছ থেকে আমরা উৎপাদন চাই, কিন্তু সেই উৎপাদনের ঝুঁকি ও ব্যয়ের ভার কতটা তাঁর একার ওপর থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মৌসুমি প্রণোদনা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৃষিনীতি, সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা এবং জ্বালানি নীতির সঙ্গে কৃষির বাস্তবতার সমন্বয়।
কৃষককে শুধু উৎপাদনের সময় সহায়তা নয়, উৎপাদনের পুরো চক্রে একটি পূর্বানুমেয় পরিবেশ দিতে হবে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে সেচ, কৃষি উপকরণ, পরিবহন ও ফসলের বাজারমূল্য পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের নীতি কতটা কৃষিবান্ধব, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

