নতুন জামালপুর ডেস্ক ।।
রাজধানীসহ সারা দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়া নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে পরিকল্পিত তৎপরতার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাশকতার নতুন ধরন ও কৌশল নিয়ে তদন্তে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে যুগান্তর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত কয়েক দিনে যেসব বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বড় একটি অংশের মালিক আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও নেতাকর্মী। নিজেদের মালিকানাধীন বাসে আগুন দিয়ে একসঙ্গে একাধিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাসে আগুন দিয়ে একদিকে জনমনে আতঙ্ক তৈরি, অন্যদিকে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিমার অর্থ দাবি করার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাশকতায় অর্থের জোগানদাতা ও মূল নির্দেশদাতাদের সম্পর্কেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজধানীর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নাশকতার ক্ষেত্রে ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়াই এ কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকে কেন্দ্র করে এমন তৎপরতার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি বাহিনী ও ইউনিটগুলোও সক্রিয় হয়েছে। রাজধানীতে এসআরবি, ডিএমপি, ডিবি ও সিটিটিসি একযোগে কাজ করছে। রাজধানীর বাইরে দেশের সব বিভাগ ও জেলায়ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক নাশকতার ধরন ও কৌশল সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর ভিত্তিতে রাজধানীর প্রবেশমুখ এবং পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, বাসাবো ও খিলগাঁও। পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে রয়েছে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বসিলা এবং মিরপুরের শেষ অংশ। এসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা প্রথমে ককটেল নিক্ষেপের মাধ্যমে তৎপরতার মহড়া শুরু করে। পরে বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বড় ধরনের নাশকতার অংশ হিসেবে রোববার রাতে কমলাপুরে ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন কেপিআইভুক্ত বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।
এমন তথ্যের ভিত্তিতে দেশের কেপিআইগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনার পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষ টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব স্থাপনার তালিকা তৈরি করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থায়ন ও ইন্ধন রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, ওই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তারা দেশের ভেতরে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ পাঠাচ্ছেন। তাদের নির্দেশেই দেশে অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অর্থের জোগানদাতা ও মূল নির্দেশদাতাদের তথ্য পেয়েছে উল্লেখ করে মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে যেসব বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তার একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত বা দলটির নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন গণপরিবহণ। নিজেদের বাসে আগুন দেওয়া একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এর মাধ্যমে একদিকে তাদের নজর অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জন এবং নাশকতার দায় সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহণ খাতে কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করে রাজপথ অচল করার পরিকল্পনাও থাকতে পারে বলে পুলিশের দাবি। রেল যোগাযোগ ব্যাহত করতেও একই চক্র আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ইনচার্জ) ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, রেলস্টেশনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর সারা দেশের রেলপথ ও স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও সাইমুন নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রায়হান বাংলাদেশ রেলওয়ের কমলাপুর রেলস্টেশনের এমওডি শাখায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপর গ্রেপ্তার সাইমুন শাহজাহানপুর থানা এলাকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনের নাম ও পরিচয় পাওয়া গেছে বলেও জানান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রোববার রাতে ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় ওই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নাশকতার জন্য মূলত রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নাশকতার পর দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ।
রাজধানীর প্রবেশমুখ ও সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এসব এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যাওয়া কিংবা নগরীর ভেতরের বিভিন্ন অলিগলিতে আত্মগোপন করা তুলনামূলক সহজ বলে মনে করছে গোয়েন্দা সংস্থা। কেন্দ্রীয় এলাকার তুলনায় রাজধানীর প্রান্তিক অঞ্চলে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল কিছুটা কম থাকার সুযোগও নাশকতাকারীরা নিচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
গোয়েন্দা সূত্র আরও বলছে, ঝটিকা মিছিল থেকে হঠাৎ ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা বাসে আগুন দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার জন্য এসব এলাকাকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছে অপরাধীরা।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহণে অগ্নিসংযোগ, ককটেল নিক্ষেপ ও অন্যান্য নাশকতার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ এমন একটি চিত্র তৈরি করা।
রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম সীমানায় নাশকতার প্রবণতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব এলাকা ঢাকার প্রবেশদ্বার বা প্রান্তিক অঞ্চল হওয়ায় অপরাধীরা সেখানে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত শহরের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় ঘনবসতি এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস বেশি হওয়ায় অপরাধীরা গোপন আস্তানা হিসেবে সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ পায়।
ডিবিপ্রধান আরও বলেন, মিরপুর ও পল্লবীর গণপরিবহণে অতিরিক্ত ভিড় থাকে। রাজধানীতে চলাচলকারী অন্য অনেক বাসের তুলনায় এসব এলাকার বাসে যাত্রীদের গাদাগাদি বেশি। গণপরিবহণের এই অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগ নিয়েও অপরাধীরা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে দ্রুত সরে যেতে পারে। বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
নাশকতার ছক ফাঁসের দাবি, চার ইউনিট মাঠে




