Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
মতামত

লিবিয়ার ক্ষমতার মসনদে বসতে চান সাদ্দাম হাফতার

লিবিয়ার ক্ষমতার মসনদে বসতে চান সাদ্দাম হাফতার

এমাদেদ্দিন বাদি ।।

প্রায় সাত বছর ধরে তুরস্কের সঙ্গে ত্রিপোলিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের করা সামুদ্রিক সমঝোতার বিরোধিতা করে আসছিল লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল। অথচ গত সপ্তাহে পার্লামেন্টের এক অধিবেশনেই সেই চুক্তি অনুমোদন করে বসে তারা।

গত ২০ অক্টোবর বেনগাজিভিত্তিক প্রতিনিধি পরিষদ চুক্তিটি অনুমোদন করে। এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গ্রিস, ইসরায়েল ও মিসর।

তবে চুক্তির অনুমোদনকে তুরস্কের কূটনৈতিক বিজয় বলার চেয়ে সাদ্দাম হাফতারের সাজানো পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপ বলাই বেশি সংগত। সাদ্দাম পূর্ব লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণকারী সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ত্রিপোলি ও বেনগাজির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলোসের উদ্যোগে এগিয়ে চলা এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে সাদ্দাম লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।

তবে সে জন্য তাঁকে আঙ্কারার সমর্থন পেতে হবে। পশ্চিম লিবিয়ায় তুরস্কের ব্যাপক প্রভাব থাকায় দেশটির সম্মতি যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তুরস্কের সঙ্গে সামুদ্রিক চুক্তির অনুমোদন সাদ্দামের জন্য আঙ্কারার সমর্থন নিশ্চিত করার একটি কৌশল।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে সাদ্দামের প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলে দেওয়া। চুক্তি অনুমোদনের দুই সপ্তাহ আগে প্রতিনিধি পরিষদ থেকে স্পিকার আগিলা সালেহকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি টানা ১২ বছর এই পদে ছিলেন। এর ফলে পূর্ব লিবিয়ায় মিসরের প্রধান মিত্র এবং সামুদ্রিক সমঝোতা অনুমোদনের সবচেয়ে দৃঢ় বিরোধীকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরানো সম্ভব হয়।

তবে সালেহকে সরানোর বিষয়টি কেবল মিসরকে ঘিরে ছিল না। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে আরেকটি বাধাও দূর হয়েছে। স্পিকার হিসেবে সালেহ ছিলেন আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের প্রতীক, যেখান থেকে খলিফা হাফতারের সামরিক কর্তৃত্বও একধরনের বৈধতা পেত। ওবেইদাত গোত্রের মধ্যে তাঁর শক্তিশালী ভিত্তি ছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলা, এমনকি মধ্যস্থতা করার মতো সামর্থ্যও ছিল তাঁর।

তাঁকে সরিয়ে দেওয়ায় সাদ্দামের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সহজ হয়েছে। খলিফা হাফতারের বয়সও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যেকোনো সময় তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রশ্নটি সামনে চলে আসতে পারে।

সালেহর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আল-সালহিন আবদুননবি। তিনিও ওবেইদি গোত্রের সদস্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের লিবিয়া-তুরস্ক বন্ধুত্ব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নিয়োগের মধ্য দিয়ে একদিকে গোত্রভিত্তিক অসন্তোষের আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা হয়েছে, অন্যদিকে সংসদ এখন কার নির্দেশনা অনুসরণ করছে, তারও একটি ইঙ্গিত মিলেছে।

সাদ্দামের এই কৌশল সফল হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের ওপর। তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তদবির এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্কের কারণে লিবিয়ায় একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের আগ্রহ বেড়েছে। সাদ্দাম সেই আগ্রহের ওপরই ভরসা করছেন।

তাঁর আশা, ওয়াশিংটনের সমর্থন গ্রিস ও সাইপ্রাসের আপত্তি এবং আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলের অস্বস্তিকে ছাপিয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মার্কিন অংশীদারত্বের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলের বিরোধিতায় জোর দেওয়ার মাধ্যমে সাদ্দাম নিজের দেশের রাজনীতিতেও সুবিধা পেতে পারেন। এতে তাঁকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর কোনো গোপন যোগাযোগ রয়েছে কি না, এমন সন্দেহও দূর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্যত নিজের গুরুত্ব কমিয়ে ফেলেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বেনগাজি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার এবং তিনটি সদস্যদেশের মন্ত্রীকে সেখানে পৌঁছানোর পর বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু ইউরোপের রাজধানীগুলোর প্রতিক্রিয়ায় দৃঢ়তার চেয়ে নতিস্বীকারের প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।

এর এক বছরেরও কম সময় পর গ্রিসে আমন্ত্রণ জানানো হয় সাদ্দামকে। সেখানে গিয়েও বিকল্প কোনো সামুদ্রিক সমঝোতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এড়িয়ে যান তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দুর্বল অবস্থানের পেছনে রয়েছে অভিবাসন নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ। লিবিয়া থেকে ক্রিট দ্বীপের দিকে কত নৌকা যাত্রা করছে, তা গণনা করাই যেন ইউরোপের লিবিয়াবিষয়ক নীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এখন যে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ চলছে, সেই জলপথ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব সাদ্দামের কাছেই চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এমন অবস্থায় সমুদ্রসীমার মানচিত্র বদলে দেওয়ার জন্য তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও সাদ্দামের সাফল্য দেখতে আগ্রহী। খলিফা হাফতারের ছেলেদের মধ্যে সাদ্দামই আমিরাতের প্রতি সবচেয়ে অনুগত বলে বিবেচিত। লিবিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে তাঁর অধিষ্ঠান হলে হাফতার প্রকল্পে এক দশকের আমিরাতি বিনিয়োগের পরিণতি মিলবে। অতীতে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা থাকলেও তুরস্কের পক্ষে সামুদ্রিক সীমারেখা মেনে নেওয়া আমিরাতের কাঙ্ক্ষিত ফলের জন্য তুলনামূলক ছোট মূল্য। তবে আঙ্কারার সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে সাদ্দামের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা মিসরকে ঘিরে। সামুদ্রিক সমঝোতার বিরুদ্ধে কায়রোর বিবৃতিতে মূলত মিসরের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর এর প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। বিবৃতিটি প্রায় পুরোপুরি আইনি যুক্তির ওপর দাঁড়ানো। এর অর্থ হতে পারে, রাজনৈতিকভাবে নিজেদের বিকল্প খোলা রাখছে মিসর।

আঙ্কারার সঙ্গে কায়রোর সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন এসেছে। সুদান ও লোহিত সাগর প্রশ্নে এখন দুই দেশ কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগও তাদের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব মিসরের বিরোধিতা কমাতে পারে। তবে আঙ্কারার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে কায়রো হাফতার পরিবারের অন্য কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে দূরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। সাদ্দামের ভাই খালেদ হাফতার লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসের চিফ অব স্টাফ। তিনি কায়রোর অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ এবং গত এপ্রিলে মার্কিন উদ্যোগের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন।

মিসর যদি খালেদকে সমর্থন করে, তাহলে সাদ্দামের হাতে দর-কষাকষির মতো খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। তুরস্কের সঙ্গে সমঝোতার বিনিময়ে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান হাতিয়ারটি ইতিমধ্যেই তিনি ব্যবহার করে ফেলেছেন। তবে তাঁর হাতে এখনো একটি শক্তিশালী চাল রয়েছে, যা ব্যবহার করতে তাঁকে কখনোই অনুমতি দেবে না আবুধাবি।

সুদানের র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের প্রতি সমর্থন বন্ধ করলে আঙ্কারা ও কায়রো উভয়েরই সমর্থন পেতে পারেন সাদ্দাম। কারণ, দুই দেশই সুদানের সেনাবাহিনীর সমর্থক। কিন্তু এমন পদক্ষেপ নিলে সেই সম্পর্কই ঝুঁকিতে পড়বে, যা হারানোর সামর্থ্য তাঁর নেই।

আবুধাবির মতো পৃষ্ঠপোষককে অসন্তুষ্ট করতে না পারা এবং তুরস্কের মতো অংশীদারের কাছ থেকে ইতিমধ্যে প্রত্যাশিত সুবিধা আদায় করে নেওয়ার পর সাদ্দাম এখন এমন এক সমীকরণে আটকে আছেন, যেখানে তাঁকে দুই পক্ষকেই নিজের পাশে রাখতে হবে। তাঁর বাজি হলো, ওয়াশিংটন সমঝোতা কার্যকর করা পর্যন্ত এই ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।

এত ঝুঁকি নেওয়ার প্রস্তুতি তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগেরও ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তাঁর ভাইদের সঙ্গে কিংবা নতুন ব্যবস্থায় উপেক্ষিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে। সেই সংঘাত সহিংস রূপও নিতে পারে।

লিবিয়ার ইতিহাসে একধরনের নির্মম পরিহাস বারবার ফিরে আসে। ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার তুরস্কের সঙ্গে যে সামুদ্রিক সমঝোতা করেছিল, তার বিনিময়ে পাওয়া তুর্কি সামরিক হস্তক্ষেপই ২০২০ সালে রাজধানীর উপকণ্ঠে খলিফা হাফতারের অভিযান থামিয়ে দেয়। পিছু হটতে বাধ্য হয় তাঁর বাহিনী ও ভাড়াটে যোদ্ধারা।

যে রাজধানী দখল করতে গিয়ে বাবা ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই ত্রিপোলির ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন ছেলেকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আর সেই প্রচেষ্টার পথ তৈরি হচ্ছে এমন এক চুক্তির মাধ্যমে, যা একসময় তাঁর বাবার পরাজয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

সাদ্দাম সফল হলে হাফতার পরিবারের সবচেয়ে অপমানজনক পরাজয়ের স্মারক সেই চুক্তিই তাদের রাজনৈতিক বংশপরম্পরার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আর ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেলে, একই চুক্তি হয়ে উঠতে পারে সাদ্দামের ক্ষমতায় আরোহণের স্বপ্নের সমাধিলিপি।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies