Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
মতামত

পেশা আছে, নৈতিকতা কোথায়?

পেশা আছে, নৈতিকতা কোথায়?

শওকত জামান ।।

সমাজপতিরা সমাজের অভিভাবক, অথচ অনেকের আচরণে নেই সামাজিকতার ছাপ। রাজনীতিবিদেরা জনগণের ভাগ্য বদলানোর প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসেই অনেকে ভুলে যান নীতি-নৈতিকতা। সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার হয়, পুলিশের কাছে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে কেউ কেউ পড়েন উল্টো বিপাকে। উকিল-মোক্তার, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের মতো সম্মানিত পেশার কিছু মানুষের বিরুদ্ধেও উঠছে দায়িত্বহীনতা ও অর্থলোভের অভিযোগ। তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কার কাছে? কার ওপর রাখবে শেষ ভরসা?

সরকারি অফিস জনগণের সেবার জায়গা। অথচ সেবা নিতে গিয়ে মানুষকে কখনো টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে হয়, কখনো শুনতে হয় নানা অজুহাত। নিয়মমাফিক কাজ করতেও যদি বাড়তি টাকা দিতে হয়, তবে সরকারি সেবা আর অধিকার থাকে না তা হয়ে ওঠে একশ্রেণির অসাধু কর্মচারীর উপার্জনের হাতিয়ার। জনগণকে বোকা বানিয়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার এই প্রবণতা শুধু দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা।

পুলিশের দায়িত্ব মানুষের জানমাল রক্ষা করা, অপরাধ দমন করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কোথাও কোথাও ঘুষ, হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। টাকা না পেলে মামলা নেয় না, আবার কখনো নিরপরাধ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও ওঠে। আইন রক্ষকের হাতেই যদি মানুষ নিরাপত্তাহীন বোধ করে, তাহলে ন্যায়বিচারের পথ দেখাবে কে?

আইনজীবীদের কাজ বিচারপ্রার্থীর অধিকার রক্ষা করা। অথচ কিছু অসাধু আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলার জটিলতা বাড়িয়ে ফি আদায়, অযৌক্তিক খরচ চাপানো কিংবা বিচারপ্রার্থীকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় রাখার অভিযোগ রয়েছে। বিচারের আশায় আদালতে আসা মানুষ যখন মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হন, তখন ন্যায়বিচার তাঁর কাছে অধিকার নয়, বরং সামর্থ্যবানদের বিলাসিতা বলে মনে হয়।

চিকিৎসকের কাছে মানুষ যায় জীবন বাঁচানোর আশায়। চিকিৎসা পেশা যেখানে মানবসেবার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হওয়ার কথা, সেখানে কিছু প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অতিরিক্ত ফি এবং কমিশননির্ভর চিকিৎসার অভিযোগ রোগীদের উদ্বিগ্ন করে। রোগ নির্ণয়ের নামে একের পর এক পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হলে অসহায় রোগী বুঝতে পারেন না কোনটি চিকিৎসার প্রয়োজনে, আর কোনটি বাণিজ্যের স্বার্থে। চিকিৎসা তখন সেবার বদলে ব্যবসায় পরিণত হয়।

শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান তাঁর প্রধান দায়িত্ব। অথচ কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুলে ঠিকমতো পাঠদান না করে ব্যক্তিগত কোচিংয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যেতে উৎসাহিত করার অভিযোগ রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার ঘাটতি রেখে বাইরে অর্থের বিনিময়ে সেই ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষা আর অধিকার থাকে না, পণ্যে পরিণত হয়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান তখন মেধা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ে অর্থের অভাবে।

সমাজের অন্যান্য পেশাতেও একই প্রশ্ন। ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতা কি শুধু মুনাফার উৎস? সাংবাদিকের কাছে সত্য কি বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে তুচ্ছ? জনপ্রতিনিধির কাছে জনগণ কি কেবল ভোটের সময়ের প্রয়োজন? শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রতিটি পেশার মানুষের কাছেই রয়েছে দায়িত্বের প্রশ্ন। পেশাগত দক্ষতা থাকলেই মানুষ বড় হয় না; বড় হতে হলে প্রয়োজন সততা, বিবেক ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

তবে সব পেশার মানুষ এক রকম নন। এখনো অসংখ্য সরকারি কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন, অনেক পুলিশ সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান, বহু আইনজীবী বিনা পারিশ্রমিকে অসহায় মানুষের পক্ষে লড়েন, চিকিৎসক ও শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের সততা সমাজের আশার জায়গা। কিন্তু কিছু মানুষের অনিয়ম যখন পুরো পেশার সুনাম ক্ষুণ্ন করে, তখন দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সমস্যার মূলে শুধু ব্যক্তির লোভ নয়; দুর্বল জবাবদিহি, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতিও দায়ী। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে নীতি-নৈতিকতার কথা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি, দ্রুত বিচার এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একটি সমাজ তখনই সভ্য হয়, যখন সেখানে পেশার পরিচয়ের চেয়ে মানুষের চরিত্র বড় হয়ে ওঠে। রাজনীতিবিদের রাজনীতি হবে জনকল্যাণের জন্য, সরকারি কর্মচারীর চাকরি হবে জনগণের সেবায়, পুলিশের ক্ষমতা হবে নিরাপত্তার জন্য, আইনজীবীর জ্ঞান হবে ন্যায়বিচারের পক্ষে, চিকিৎসকের দক্ষতা হবে রোগীর সুস্থতার জন্য আর শিক্ষকের মেধা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কাজে।

প্রশ্ন হলো আমরা কি শুধু পেশার পদবি নিয়ে বাঁচব, নাকি সেই পেশার নৈতিক দায়িত্বও পালন করব?

সমাজপতির সামাজিকতা, রাজনীতিবিদের নীতি, সরকারি কর্মচারীর সততা, পুলিশের মানবিকতা, আইনজীবীর ন্যায়পরায়ণতা, চিকিৎসকের সেবাবোধ আর শিক্ষকের আদর্শ এসব ফিরিয়ে আনতে না পারলে উন্নয়নের বড় বড় হিসাব দিয়েও লাভ নেই। কারণ সড়ক, সেতু, ভবন ও অবকাঠামো দিয়ে রাষ্ট্র গড়া যায়, কিন্তু সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা ছাড়া সমাজ গড়া যায় না।

নীতি হারালে পেশা থাকে, পদ থাকে, ক্ষমতা থাকে
কিন্তু মানুষের বিশ্বাস থাকে না। আর মানুষের বিশ্বাস হারানোই একটি সমাজের সবচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies