খাদেমুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ ||
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার এক সময়ের খরস্রোতা ঝারকাটা নদীর পানি শুকিয়ে রূপ নিয়েছে
সবুজ ফসলি জমিতে। দখল-দূষণ আর দীর্ঘদিন খনন না করায় বালু ও পলি জমে নদীটি নাব্যতা
হারিয়ে সংকুচিত হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এখন নদীর বুকে চাষ করা হচ্ছে ধান, গম,
মরিচ, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল। বর্ষা মৌসুমে এক-দুই মাস নদীতে পানি দেখা গেলেও বর্ষা
মৌসুম শেষ হতে না হতেই আবার নদীটি তার আপন সত্তা হারিয়ে শুকিয়ে যায়। নাব্যতা
হারিয়ে খরস্রোতা ঝারকাটা নদী এখন শুধুই স্মৃতি। নদীটি খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানিয়েছেন স্থানীরা।
জানা গেছে, ১৯৪৫ সালের দিকে ঝারকাটা নদীর উৎপত্তি হয়। নদীটির দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার,
গড় প্রস্থ ১৩২ মিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক ঝারকাটা নদীর প্রদত্ত
পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং- ১৯। ইসলামপুর উপজেলার হারগিলা নামক স্থানে
যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনের ফলে মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর হয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার ঝারকাটা,
নলছিয়া, বাগলেরগড়, জটিয়ারপাড়া ও গুনারিতলা হয়ে সরিষাবাড়ি উপজেলা দিয়ে যমুনার নদীর
সাথে মিলিত হয়ে এ নদীর সৃষ্টি হয়। এরপর বিভিন্ন সময় নদীতে অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু
নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
পাশাপাশি অবৈধ দখল-দূষণ এবং বালু ও পলি জমার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনেও ড্রেজিং না করায় খরস্রোতা ঝারকাটা নদী ভরাট হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানি সংকটে নদীতে মাছ না থাকায় দুই তীরের বসবাসকারী শতাধিক জেলে পরিবার বেকার হয়ে পড়েছে। জেলেরা জীবিকার তাগিদে ছেড়ে দিচ্ছেন বাপ-দাদার পেশা।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার চরপাকেরদহ, কড়ইচড়া ও গুনারীতলা ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে বয়ে চলা
ঝারকাটা নদীর কোন স্থানে বালু ও পলি মাটিজমে জেগেছে চর, আবার কোথাও পরিণত হয়েছে
দিঘিতে। পানি না থাকায় তীরবর্তী চাষিরা নদীর বুকে ধান, মাসকালাই, মরিচ, গম, ভুট্টা,
খেসারিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করেছেন। দেখে মনে হয় নদীর কোন অস্তিত্ব নেই।
অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দিঘির সৃষ্টি হয়েছে। সেই
দিঘিতে মাছ শিকার ও গবাদি পশু গোসলের দৃশ্যও চোখে পড়ে।
গুনারীতলা ইউনিয়নের গুনারীতলা পূর্বপাড়া এলাকার বৃদ্ধ সুরুজ মিয়া, তোফাজ্জল হোসেন ও
চরপাকেরদহ ইউনিয়নের ঝারকাটা এলাকার আলাল মন্ডল, মোয়াজ্জেম হোসেনসহ বেশকয়েকজন
জানান, প্রায় দুইযুগ আগেও নদীটি জীবন্ত ছিল। এখন বর্ষাকালে ঝারকাটা নদীতে পানির
যৎসামান্য প্রবাহ থাকলেও শুস্ক মৌসুমে ফসলের জমিতে পরিণত হয়। নদীটি মরে যাচ্ছে। নদীটি
বাঁচাতে কারও কোন তৎপরতা নেই বলে জানান তারা।
কড়ইচড়া ইউনিয়নের জটিয়ারপাড়া গ্রামের অশীতিপর তোতা মিয়া বলেন, এক সময় নদীতে
প্রবল স্রোত ছিল। গাংচিল, মাছরাঙা বকসহ বিভিন্ন প্রজাতি পাখির কলকাকলিতে মূখরিত
থাকত নদী এলাকা। নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। আজ সেই পাখির
বিচরণ, সেই মাছ ধরার দৃশ্য এখন চোখে পড়েনা।
একই ইউনিয়নের ভাংবাড়ী এলাকার গিয়াস মিয়াজী বলেন, খরস্রোতা ঝারকাটা নদীর জৌলুস
আর নেই। নেই তার তর্জন-গর্জন। দখল-দূষণ আর নাব্যতা সংকটে বিলিনের পথে এই নদী। পানি
শুকিয়ে নদীটি সবুজ ফসলি জমিতে রূপ নিয়েছে। দ্রুত দখল-দূষণ মুক্ত করে নদী খননের দাবি
জানাচ্ছি।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বলেন, পলি ও
বালুর স্তর পড়ে ঝারকাটা নদীর প্রসস্ত ও গভীরতা কমে প্রায় সমতল হয়ে গেছে। জেগে উঠা চরে
চাষাবাদ চলছে। নদীতে ড্রেজিং করার প্রস্তাব উর্দ্ধতন কর্তপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অনুমোদন পেলেই নদীটিতে ড্রেজিং এর কাজ শুরু করা হবে।




