রাশেদুল ইসলাম রনি ।।
জামালপুরের বকশীগঞ্জে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। এদিকে অন্তঃসত্ত্বা ওই কিশোরী এখন সন্তান প্রসবের অপেক্ষায়। মামলা করার পর থেকে আসামিপক্ষ ও স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে পরিবারটিকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এতে দরিদ্র পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের দিনমজুর মানিক মিয়ার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
চলতি বছর তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনায় তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ২ জানুয়ারি রাতে বসতঘরে একা পেয়ে রোমান মিয়া ওরফে রশিদ (৩০) ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। এ সময় তাঁকে হত্যার ভয় দেখানো হয়। পরে কিশোরীর শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে বকশীগঞ্জের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়।
সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক তাকে অন্তঃসত্ত্বা বলে জানান।এ ঘটনায় কিশোরীর বাবা মানিক মিয়া বাদী হয়ে বকশীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১)/৩০ ধারায় মামলা করেন। মামলায় রোমান মিয়া ও তাঁর সহযোগী রাব্বি হাসান (২০) আসামি। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।
মামলার বাদী মানিক মিয়া অভিযোগ করেন, মামলা করার পর থেকেই আসামিপক্ষের লোকজন তাঁদের মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, গোপালপুর এলাকার মৃত রইচ উদ্দিন মাস্টারের ছেলে ও গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সেলিম মিয়াও তাঁদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।মানিক মিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ের সর্বনাশ করার পরও আসামিদের পক্ষ নিয়ে আমাদের মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে হাত-পা ভেঙে দেওয়া এবং পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
মানিক মিয়া জানান, নিরাপত্তার জন্য তিনি ১৯ সেপ্টেম্বর বকশীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডির নম্বর ৮৫।জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বর আসামিপক্ষের কয়েকজন লোক তাঁদের বাড়ির সামনে গিয়ে মামলা তুলে না নিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে হুমকি দেন। এরপর থেকেই পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক সেলিম মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কাউকে হুমকি দিইনি এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য কোনো চাপও সৃষ্টি করিনি।’এ বিষয়ে গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম ফারুকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেব না, যা পারেন করেন।’
বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নিয়মিত মামলা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’
এদিকে সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় কিশোরীটির চিকিৎসা ও প্রসবকালীন ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারটি। তার বাবা মানিক মিয়া দিনমজুর। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার, যাতায়াত এবং হাসপাতালে ভর্তি—এসব খরচ বহন করার সামর্থ্য তাঁর নেই।অসহায় পরিবারটির দাবি, একদিকে মেয়ের চিকিৎসা ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে মামলা তুলে নিতে হুমকি—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন তাঁরা। পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা এবং কিশোরীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সহায়তার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।




