সিএনএন।। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ব্যাপক দাঙ্গার ঘটনায় অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা একদল বিক্ষোভকারীর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে, কোথাও সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাতেও আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
এ ঘটনায় দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে আসার পর অভিযোগ উঠেছে, সরকার সংকটের ব্যাপকতা আগেভাগে বুঝতে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যেই আগামী বছরের বসন্তে ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ ছিলেন। তবে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, অনেকেই সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।
রোববার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। যারা লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করার চেষ্টা যারা করেছে, তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহে একাধিক বৈঠকের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। এসব বৈঠকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শোনার কথা জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তবে এসব উদ্যোগে ফ্রান্সের বিক্ষোভ পরিস্থিতি শান্ত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন জোরালো হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
যেভাবে শুরু হলো আন্দোলন
গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সম্পদ বাড়ানোর দাবি জানান। কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনে নেওয়ার পর ধর্মঘট শেষ হয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকট ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে থাকা ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ জমছিল। একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। কিছু স্থানে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে এবং লাখো মানুষকে রাজপথে নামতে উৎসাহিত করে।
এক কিশোরীর ওপর পুলিশের এক সদস্যের নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে গলা চেপে ধরার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জনরোষ আরও বাড়ে।
শিক্ষা খাতের সংকট দিয়ে শুরু হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হয়। এতে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অসন্তোষ, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবি।
শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৫৭ বছর বয়সী মারিয়া পালাস বলেন, এভাবে আর চলতে পারে না। জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্ব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণেরা কাজের সন্ধানে বের হয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি পেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে কিছুই থাকছে না।
সপ্তাহান্তে কী ঘটেছে
শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অধিকাংশ স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্যারিসে মুখোশধারী তরুণদের কয়েকটি দল দোকানপাটে লুটপাট চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। লিওঁ শহরে পর্যটন দপ্তরের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলের চূড়া আগুনে ধসে পড়ে। ঐতিহাসিক এ স্থাপনার আগুনের দৃশ্য অনেকের মনে নটর ডাম ক্যাথেড্রালে অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
প্যারিসসহ রাজধানী অঞ্চল ইল-দ্য-ফ্রঁসে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
রোববার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ঘটে। প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। সোমবার বিক্ষোভকারীরা লুভর জাদুঘরে প্রবেশের পথ অবরোধ করলে কর্তৃপক্ষ জাদুঘরটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় মার্সেই শহরে দুপুর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব ধরনের সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষ।
সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর প্যারিসের পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন শহরটিতে অবস্থানরত এক পর্যটক। রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কেউ লুটপাট ও ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছেন, আবার কেউ মনে করছেন, পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হওয়ার আগেই সরকারকে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
মার্সেইয়ের ৫৯ বছর বয়সী এক বাসিন্দা ফারিদা রয়টার্সকে বলেন, নিজের শহরকে এভাবে বিধ্বস্ত হতে দেখা হৃদয়বিদারক। প্রতিটি বিক্ষোভের পর যদি দোকানের কাচ ভাঙা হয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তছনছ করা হয়, তাহলে এ পরিস্থিতি চলতে পারে না।
তবে বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন কেউ কেউ। প্যারিসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা পাওলা ফোরমেন্তি বলেন, মানুষের ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। যদিও সহিংসতার নিন্দা জানাতে হবে, তবে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানুষের দাবি শোনা এবং সেগুলোর জবাব দেওয়া।
রোববারের ভাষণে মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের কারণগুলো স্বীকার করেন। জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেননি।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজও স্বীকার করেছেন, দাঙ্গার ব্যাপকতা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ আগাম ধারণা করতে পারেনি। তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি।
সামনে কী, ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে কি বিক্ষোভ
ফ্রান্সের এই আন্দোলন আগামী বসন্তে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন ও বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর সমর্থন বাড়ছে।
লে পেন অভিযোগ করেছেন, মানুষের যৌক্তিক সামাজিক ক্ষোভকে আবারও উগ্র বামপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে মেলঁশোঁ বারবার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই সময়ে বিক্ষোভ হয়েছে। বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার কয়েক দশ হাজার মানুষ মিছিল করেছেন।
ইতালির মিলান শহরেও টানা দুই রাত ধরে অস্থিরতা দেখা দেয়। বিক্ষোভকারীরা পাথর নিক্ষেপ ও সুপারমার্কেটে লুটপাট চালান। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করে।
আলবেনিয়াতেও কয়েক মাস ধরে শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্দোলন করছেন। রাজধানী তিরানায় সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। এ সময় দাঙ্গা পুলিশের দিকে একজনকে পেট্রলবোমা ছুড়তে দেখা যায়।
এসব দেশের কর্তৃপক্ষ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে এবং শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিমোজের জ্বলন্ত টাউন হলের একটি ভিডিও প্রকাশ করে অভিবাসননীতির ব্যর্থতাকে অস্থিরতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে এক সমাবেশে ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে কথা বলেন। রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিতলে পাঁচ হাজার ডলারের লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘চলো, ফ্রান্সে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দিই এবং সেখানে আমাদের পাঁচ হাজার ডলার খরচ করি।’
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা এখন শুধু শিক্ষা খাতের অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নেই। জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, সামাজিক বৈষম্য ও সরকারের প্রতি আস্থার সংকট একসঙ্গে আন্দোলনকে বিস্তৃত করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ পাওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করা, একই সঙ্গে সহিংসতা ও জনজীবনে বিপর্যয় ঠেকানো।




