দৈনিক নতুন জামালপুরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা জেলেপল্লিগুলো আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। যে নদী একসময় জেলেদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল, সেই নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাদের জীবন। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে কেউ ইজিবাইক চালাচ্ছেন, কেউ খুঁজছেন বিকল্প আয়ের পথ। এ দৃশ্য কেবল কয়েকটি পরিবারের পেশা পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক জীবন, ঐতিহ্য ও জীবিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসার এক নির্মম বাস্তবতা।
ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী ইউনিয়নের গুঠাইল জেলেপল্লীতে প্রায় ৮০টি পরিবারের বসবাস। নদীতে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেই এসব পরিবারের অধিকাংশের জীবিকা চলত। কিন্তু নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মাছ ধরার ওপর মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার মতো বাস্তবতায় তাদের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। শ্রী মোহন চন্দ্র দাস, পুলক দাস ও রমণী দাসের মতো জেলেদের ইজিবাইক চালানোর পেশায় যুক্ত হওয়া সেই সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। পৈতৃক পেশার প্রতি গভীর টান থাকা সত্ত্বেও যখন তা দিয়ে সংসার চলে না, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া আর কী পথ থাকে?
জেলে নবীন চন্দ্র দাসের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই সংকটের মানবিক দিক। নদীতে মাছ না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অনেক সময় অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। ফকিরপাড়া এলাকার আপন চন্দ্র দাসের কথাতেও একই অসহায়ত্ব। জালের সঙ্গে যাদের নিবিড় সম্পর্ক, সেই মানুষগুলোই আজ জাল ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ জেলে হওয়া তাদের কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি বংশপরম্পরায় পাওয়া জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা ও পরিচয়ের অংশ।
ইসলামপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়ের তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ১৮০টি জেলেপল্লী রয়েছে, যেখানে বসবাস করে প্রায় ২ হাজার ৬১০টি পরিবার। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা সংকুচিত হওয়া মানে একটি এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও চাপ সৃষ্টি হওয়া। জেলেরা পেশা পরিবর্তন করলে তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো পরিবারের আয় নিশ্চিত করার একটি পথ তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে হারিয়ে যেতে পারে স্থানীয় মৎস্যজ্ঞান, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী পেশার ধারাবাহিকতা।
এ সংকটের পেছনে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছের পোনা ধরার কারণে নদ-নদীতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। ছোট মাছ ও পোনা নির্বিচারে নিধন করা হলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। তবে মাছ কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণও বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত না করে কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
নদীতে মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা, জলজ পরিবেশ রক্ষা এবং জেলেদের ন্যায্য জীবিকা নিশ্চিত করার উদ্যোগ একই সঙ্গে চলতে হবে। এ জন্য মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জেলেদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে পরিকল্পনার অংশ করতে হবে, কারণ নদীর পরিবর্তন ও মাছের প্রাপ্যতা সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
নদী শুধু মানচিত্রের একটি জলধারা নয়; নদী অসংখ্য মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেই নদীতে মাছ কমে গেলে সবচেয়ে আগে বিপদে পড়েন প্রান্তিক জেলেরা। অথচ পরিবেশগত সংকটের দায় বহন করার সামর্থ্য তাদের সবচেয়ে কম। তাই তাদের দুর্দশাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর সংকট।
আমরা মনে করি, ইসলামপুরের জেলেদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে খাদ্যসহায়তা বাড়ানো, নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে নদী ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

