Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
সম্পাদকীয়

রাজিব পরিবহনের মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?

রাজিব পরিবহনের মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?

একটি বাস। একের পর এক দুর্ঘটনা। আর দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। মাত্র ৩২ দিনের ব্যবধানে রাজিব পরিবহনের বাস জড়িত দুটি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। সর্বশেষ ২ অক্টোবর ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাসে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন সাতজন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনই জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা। একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু এই ঘটনাকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৮৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা, তাঁর ছেলে, নাতনি ও পাঁচ বছর বয়সী এক নাতি। নাতনি মর্জিনা ছিলেন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

এর আগে ৩১ আগস্ট জামালপুরের লাহিড়ীকান্দায় রাজিব পরিবহনের বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান আরও চারজন। অর্থাৎ, এক মাসের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে দুটি দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ১১টি প্রাণ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২১ মাসে রাজিব পরিবহনের বাস জড়িত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৮। এই পরিসংখ্যান কেবল কয়েকটি দুর্ঘটনার হিসাব নয়, বরং জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই রুটে রাজিব পরিবহনের কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। অন্য কোনো পরিবহনের উপস্থিতি না থাকায় এই পথে যাতায়াতকারী মানুষের সামনে বিকল্প পরিবহনও সীমিত। ফলে একটি পরিবহনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সেবার মান শুধু তার নিজস্ব যাত্রীদের বিষয় থাকে না, বরং একটি বড় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি রুটে যদি একটি পরিবহনেরই প্রায় একক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে সেই পরিবহনের যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের দক্ষতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মঘণ্টা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি থাকা কি উচিত নয়?

প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা পরিস্থিতি থাকতে পারে। তদন্তের আগে কোনো নির্দিষ্ট দুর্ঘটনার জন্য চালক, পরিবহনমালিক কিংবা অন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়। কিন্তু একই পরিবহনের বাসকে ঘিরে বারবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে সেই পরিবহনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যানবাহনের অবস্থা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনার পর সাধারণত শোক প্রকাশ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং বিচারের দাবি ওঠে। কিছুদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু যাঁরা স্বজন হারান, তাঁদের জীবনে সেই স্বাভাবিকতা আর ফিরে আসে না। ময়মনসিংহের দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হারানোর বেদনা কোনো ক্ষতিপূরণে পূরণ হওয়ার নয়। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য, বৃদ্ধ মা, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুর মৃত্যু আমাদের সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রশ্ন উঠছে, রাজিব পরিবহনের বাসগুলোর ফিটনেস নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না। চালকদের বৈধ লাইসেন্স, পেশাগত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কি না। চালকদের মাদক পরীক্ষা এবং গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদারক করা হচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পরিবহনমালিকদের দিতে হবে।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান যাচাই করাও জরুরি। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন, দুর্ঘটনার মামলা, নিহতের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, সড়ক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ভুল তথ্যই কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি।

দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা মামলা করাই যথেষ্ট নয়। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোনো বাসের ফিটনেসে অনিয়ম, চালকের অবহেলা কিংবা পরিবহন পরিচালনায় দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পাশাপাশি এই রুটে বিকল্প ও প্রতিযোগিতামূলক গণপরিবহন ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট পরিবহনের ওপর যাত্রীদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলে নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিযোগিতা নিজে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়, তবে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।

রাজিব পরিবহনের বাস জড়িত দুর্ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। গত ৩১ আগস্ট ও ২ অক্টোবরের দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণ করা হোক। একই সঙ্গে প্রায় ২১ মাসের দুর্ঘটনাগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে কোনো ধারাবাহিক নিরাপত্তাগত দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের জীবনকে পরিবহন ব্যবসার হিসাবের চেয়ে বড় করে দেখতে হবে।

কারণ, নিহত ১৮ জন নিছক একটি পরিসংখ্যান নন। তাঁরা ১৮টি প্রাণ, অসংখ্য স্বজনের আশ্রয়, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাঁদের শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। আর কোনো পরিবার যেন এভাবে একসঙ্গে একাধিক স্বজনকে হারিয়ে নিঃস্ব না হয়, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র, পরিবহনমালিক ও সংশ্লিষ্ট সবার।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies