Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
বিশেষ

হিসাব আলীর আজব হিসাব

হিসাব আলীর আজব হিসাব


।।আতিকুর রহমান।।

গ্রামের নাম অঙ্কপুর। নাম শুনে মনে হতে পারে, গ্রামের মানুষজন সারাদিন বসে বসে যোগ-বিয়োগ করে। আসলে তা নয়। তবে গ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটির নাম ছিল হিসাব আলী। তিনি অঙ্কে খুব ভালো ছিলেন। এতটাই ভালো যে, বাজারে এক টাকা কম-বেশি হলে তাঁর চোখ কপালে উঠে যেত।
হিসাব আলীর একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। দোকানের নাম—“হিসাব-নিকাশ ভাণ্ডার”।
একদিন সকালে তাঁর দোকানে এলেন গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেব।
চেয়ারম্যান বললেন,
—হিসাব ভাই, এক কেজি চিনি, দুই কেজি চাল আর তিন কেজি ডাল দেন তো।
হিসাব আলী সঙ্গে সঙ্গে খাতা খুলে হিসাব শুরু করলেন।
—চিনি ১ কেজি, চাল ২ কেজি, ডাল ৩ কেজি। মোট কত?
চেয়ারম্যান বললেন,
—ছয় কেজি।
হিসাব আলী চোখ বড় করে বললেন,
—না! আপনি ভুল করছেন।
চেয়ারম্যান অবাক।
—কীভাবে?
—কারণ আপনি শুধু ওজন যোগ করেছেন। দাম যোগ করেননি!
চেয়ারম্যান মাথা চুলকে বললেন,
—আচ্ছা, তাহলে দাম কত?
হিসাব আলী হিসাব করে বললেন,
—সব মিলিয়ে ৭৮০ টাকা।
চেয়ারম্যান পকেট থেকে ১ হাজার টাকার নোট বের করে দিলেন।
হিসাব আলী ২২০ টাকা ফেরত দিয়ে বললেন,
—এই নিন।
চেয়ারম্যান চলে যাওয়ার সময় বললেন,
—আপনার অঙ্ক সত্যিই ভালো!
হিসাব আলী গর্ব করে বললেন,
—অঙ্ক ভালো না হলে সংসার চলে?
ঠিক তখন পাশ থেকে গ্রামের স্কুলের গণিত শিক্ষক মজিদ স্যার বললেন,
—সংসার শুধু অঙ্কে চলে না, হিসাব আলী।
হিসাব আলী একটু অবাক হয়ে বললেন,
—কেন স্যার? সংসারে তো সবকিছুর হিসাব আছে।
মজিদ স্যার মুচকি হেসে বললেন,
—ভালোবাসার হিসাব আছে?
—আছে। কে কত ভালোবাসল, সেটা তো বোঝা যায়।
—সম্মানের হিসাব?
—সেটাও আছে।
—মায়ের মমতার হিসাব?
হিসাব আলী এবার চুপ।
স্যার বললেন,
—মানুষের জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর অনেকগুলোরই কোনো দাম নেই। আবার টাকার অঙ্কে যার মূল্য কম, তার মূল্য জীবনে অনেক বেশি হতে পারে। হিসাব আলী কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,
—তাহলে স্যার, গণিত কি জীবনে সব হিসাব করতে পারে না?
মজিদ স্যার বললেন,
—গণিত আমাদের হিসাব করতে শেখায়, কিন্তু জীবন আমাদের শেখায়—কোন হিসাবটা করতে হবে।
সেদিন সন্ধ্যায় হিসাব আলীর দোকানে এক বৃদ্ধ এলেন। তিনি এক কেজি চাল কিনলেন। টাকা দিতে গিয়ে দেখলেন, তাঁর কাছে ৫ টাকা কম।
তিনি লজ্জায় বললেন,
—বাবা, ৫ টাকা কাল দিয়ে যাব।
হিসাব আলী খাতা খুললেন। একটু হিসাব করলেন। তারপর বললেন,
—না চাচা, ৫ টাকা লাগবে না।
বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন,
—কেন?
হিসাব আলী হেসে বললেন,
—আজ আমি একটা নতুন অঙ্ক শিখেছি।
—কী অঙ্ক?
—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্ক। বৃদ্ধের চোখে পানি চলে এল।
পরদিন সকালে হিসাব আলী দোকানের সামনে নতুন একটি সাইনবোর্ড লাগালেন—
“এখানে টাকা-পয়সার হিসাব হয়,
কিন্তু মানুষের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা হয় না।”
মজিদ স্যার সাইনবোর্ড দেখে বললেন,
—এবার বুঝলে?
হিসাব আলী বললেন,
—জি স্যার। যোগ-বিয়োগ শিখেছি অনেক আগে। আজ বুঝলাম, জীবনে কখন কোথায় বিয়োগ করতে হয়, আর কোথায় যোগ করতে হয়—সেটাই আসল গণিত।
স্যার হেসে বললেন,—তাহলে বলো তো, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় যোগ কী? হিসাব আলী একটু ভেবে বললেন—একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ালে যে যোগফল তৈরি হয়, তার নামই হয়তো মানবতা।
মজিদ স্যার বললেন, —ঠিক বলেছ। আর সেই অঙ্কে কোনো ক্যালকুলেটর লাগে না। দুজনেই হেসে উঠলেন।

শেষ কথা: আমরা প্রতিদিন কত হিসাব করি—বেতন কত, খরচ কত, লাভ কত, ক্ষতি কত। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলো অনেক সময় খাতায় লেখা থাকে না।
কত টাকা আয় করেছি—তার হিসাব একদিন শেষ হবে। কত সম্পদ করেছি—তার হিসাবও একদিন অন্যের হাতে চলে যাবে।
কিন্তু কতজন মানুষের মুখে হাসি এনেছি, কতজন বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি—এই হিসাবটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়।
গণিত আমাদের শেখায়, শূন্যেরও মূল্য আছে।
জীবনও শেখায়—নিজেকে কখনো বড় মনে না করে অন্যের পাশে দাঁড়ালে, সেই শূন্যও একদিন অসীম মূল্য পেতে পারে। তাই জীবনের অঙ্কে শুধু যোগ-বিয়োগ নয়, মানুষকে যোগ করুন, অহংকার বিয়োগ করুন; ভালোবাসা গুণ করুন, ঘৃণা ভাগ করে দিন। তাহলেই হয়তো আমাদের সবার জীবনের হিসাবটা শেষ পর্যন্ত মিলবে।

লেখক: প্রকাশক,দৈনিক নতুন জামালপুর।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies