ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েক দফা দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পঞ্চম দিনেও উত্তপ্ত সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শতাধিক কারখানার শ্রমিক সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন শিল্প পুলিশের কয়েকজন সদস্যও। এদিকে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘাতের আশঙ্কায় দুই শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার সকাল ১০টার পর আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুরের নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে অনন্ত গ্রুপ ও হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনেও শ্রমিকেরা জড়ো হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে পুলিশ লাঠিচার্জের পাশাপাশি টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় কয়েক দফায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের পাশাপাশি সাভারের হেমায়েতপুরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
সংঘর্ষের মধ্যে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি পোশাক কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এতে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় অধিকাংশ চালু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক দিনের আন্দোলনে সাভার ও আশুলিয়ার মোট ২৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ সামান্য আহত হন। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। সংঘর্ষে পুলিশেরও বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে বাইপাইল এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা শ্রমিক, নাকি বহিরাগত, তা যাচাই করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাভারের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। সড়ক অবরোধের কারণে সৃষ্ট যানজট পরিদর্শনে গিয়ে আরিচা মহাসড়কে অবস্থান করে তিনি অভিযোগ করেন, পতিত সরকারের দোসররা সাভার ও আশুলিয়ার পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। বহিরাগত ব্যক্তিরা শ্রমিকদের কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে নাশকতা চালিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছে সাভার শিল্প পুলিশ। তাদের দাবি, বহিরাগতরা শ্রমিকদের কারখানা ছেড়ে মহাসড়কে আসতে বাধ্য করছে। এতে শান্তিপ্রিয় শ্রমিকেরাও কারখানা ছেড়ে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে সাভার ও আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়কে যান চলাচলেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।



