প্রকৃতির এক মুহূর্তের আঘাতে নিভে গেল ছয়টি প্রাণ। পাবনা সদর উপজেলার সোনাপাতি বিলে বজ্রপাতে ছয় কিশোর ও তরুণের মৃত্যু এবং আরও তিনজনের আহত হওয়ার ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সচেতনতা কতটা অপর্যাপ্ত।
বজ্রপাত বাংলাদেশে অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৬৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৫ সালেও প্রাণ গেছে ১৭৩ জনের। এসব পরিসংখ্যানের বড় একটি অংশ কৃষক, শ্রমজীবী ও খোলা জায়গায় অবস্থানকারী মানুষের।
আবহাওয়ার পরিবর্তনও এ ঝুঁকিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও অস্থিতিশীলতা বজ্রঝড় সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। গবেষণায় বাংলাদেশের প্রাক্বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও অস্থিতিশীলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে খোলা জায়গায় অবস্থান এড়িয়ে চলা জরুরি।
কিন্তু শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মাঠে কাজ করা কৃষক কিংবা বিলে মাছ ধরতে যাওয়া জেলের কাছে নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে পূর্বাভাস অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। কৃষিজমি, বিল, হাওর, চরাঞ্চল ও জলাশয়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর মজবুত ছাদযুক্ত বজ্রপাত-নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। এসব স্থাপনায় যথাযথ বজ্রনিরোধক ও বৈদ্যুতিক আর্থিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনাকেও প্রয়োজনে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা, স্থানীয় মাইকিং ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কৃষক-জেলেদের আগাম সতর্ক করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। বজ্রঝড়ের আশঙ্কা থাকলে কৃষিকাজ, মাছ ধরা, নৌযাত্রা ও খোলা মাঠের খেলাধুলা বন্ধ রাখতে হবে।
ব্যক্তিগত সতর্কতাও অত্যন্ত জরুরি। বজ্রপাতের শব্দ শুনলেই পাকা ও মজবুত ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। গাছের নিচে, খোলা মাঠে, জলাশয়ে কিংবা পলিথিনের ছাউনিতে আশ্রয় নেওয়া যাবে না। ঘরের ভেতরেও জানালা, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও পানির কল থেকে দূরে থাকতে হবে। শেষ বজ্রধ্বনির পর অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা উচিত। বজ্রাহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসা দিতে হবে। তাঁর শরীরে বিদ্যুৎ জমে থাকে না, তাই তাঁকে স্পর্শ করা নিরাপদ।
বজ্রপাত বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। সোনাপাতি বিলের ছয়টি মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে না যায়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উন্নত পূর্বাভাস এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের কৃষক, জেলে ও তরুণদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রকে কার্যকর দায়িত্ব নিতে হবে। দুর্যোগের সময় মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। শোক প্রকাশের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

