Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

গোমতীর তীরে আজো মধুর বাঁশরি বাজে

গোমতীর তীরে আজো মধুর বাঁশরি বাজে

অর্বাক আদিত্য ।। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে প্রেম ও বিরহের এক পরম তীর্থভূমি কুমিল্লা। এই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা গোমতী নদী কবিকে দিয়েছিল সৃষ্টির বিপুল প্রেরণা। একইসঙ্গে কুমিল্লার নার্গিস ও প্রমীলা কবিকে দিয়েছিলেন এক অনন্ত প্রেমের বাঁধন।

নজরুলের জীবনের এই অধ্যায়টি যেন সুর, বিরহ আর গভীর এক নস্টালজিয়ার মেলবন্ধন। গোমতীর ঢেউয়ে আর পাতার কুটিরে কবি রেখে গেছেন তাঁর হৃদয়ের এক না বলা আকুতি।

তাই কবি গানের সুরে সুরে বলেছেন, আজো মধুর বাঁশরি বাজে/ গোধূলি লগনে বুকের মাঝে/ আজো মনে হয় সহসা কখন/জলে ভরা দু’টি ডাগর নয়ন/ক্ষণিকের ভুলে সেই চাঁপা ফুলে/ফেলে ছুটে যাওয়া লাজে॥

পরিচয়, প্রণয় ও বিচ্ছেদের দেড় দশক পরে নার্গিসকে লেখা এক অমর চিঠিতেও কবির হৃদয়ের গভীর ক্ষত ও দগ্ধ দহনের নিবিড় চিত্র ফুটে ওঠে।

‘আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি —তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না—আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।’

যাকে নিজের জীবনের সঙ্গে বেঁধে নিতে চেয়েছিলেন, আবার আকস্মিক ত্যাগও করলেন- সেই নার্গিসকে জীবনে একটা মাত্র চিঠি লিখেছেন তিনি। সেই চিঠিতে নার্গিস তাঁর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, নার্গিসের জন্য তাঁর অন্তর্গত রোদনকে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন।

চিঠির আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন- ‘তোমার যে কল্যাণরূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের সে আগুন- বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।’

প্রেম, দ্রোহ এবং গভীর বিষাদ-বেদনার অপূর্ব সংমিশ্রণই মূলত নজরুল। তাঁর প্রেম যেন এক চিরন্তন রূপ। অপূর্ণতা আর বিরহের দহনের ভেতর দিয়ে নজরুল এক অপার্থিব প্রেমের জগত নির্মাণ করেন। সেখানে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে তাঁরই অন্তর্গত অশ্রু, শব্দে কবিতায় গানে আর রাগে। প্রিয়তমাকে দেওয়া আসনে আর কাউকেই বসাতে পারেননি তিনি। বরং জীবনভর অসীম বেদনার মন্দিরে নিয়ত পূজা করে গেছেন। অন্তর্যামী জানেন তার হৃদয়ের সেই ‘বেদনার আগুন ও ক্ষত’। তিনি নিজে আগুনে পুড়েছেন, কিন্তু প্রিয়তমাকে দগ্ধ করতে চাননি। এই চিঠিতেই তিনি পনেরো বছর আগে নার্গিসের জ্বরের সময়ের একটি স্মৃতি শেয়ার করেছেন। যা কোনোভাবেই তাঁর স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি।

১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় প্রায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেন নজরুল। এই স্বল্প সময়েই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সাহিত্যসৃষ্টিতে ঘটে গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা। কুমিল্লায় অবস্থানের সময় গোমতী নদীর শান্ত প্রবাহ, গোধূলি লগ্নের মায়াবী আলো এবং গ্রামীণ মেঠো পথ কবির সংবেদনশীল মনকে আলোড়িত করেছিল। নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে গোমতীর তীর ছিল কবির পরম আশ্রয়। এই নদীর কলতানে কবি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অপার্থিব সুরের সন্ধান। এটি পরবর্তী সময়ে তাঁর অমর সৃষ্টি নজরুলসংগীতের এক বড় অংশ জুড়ে মূর্ত হয়ে আছে।

প্রথম প্রেম ও বিচ্ছেদ

১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল কলকাতা থেকে আলী আকবর খানের সঙ্গে প্রথম কুমিল্লায় আসেন নজরুল। পরে তাঁর আতিথেয়তায় ওঠেন মুরাদনগরের দৌলতপুরে। সেখানে আলী আকবর খানের ভাগ্নি সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে কবির পরিচয় ও প্রণয় গড়ে ওঠে। নজরুল তার নাম দেন ‘নার্গিস’। দৌলতপুরে প্রায় ৭৩ দিন অবস্থানকালে নজরুলের সাহিত্যসৃষ্টিতে নার্গিস ও স্থানীয় প্রকৃতির গভীর প্রভাব পড়ে। খান বাড়ির পুকুরপাড়ে আমগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন নজরুল। এখানে বসেই রচনা করেন ‘পাপড়ি খোলা’ কবিতা। এই কবিতায় নজরুল বলেন- ‘রেশমি চুড়ির শিঞ্জিনীতে রিমঝিমিয়ে মরমকথা/ পথের মাঝে চমকে কে গো থমকে যায় ওই শরম-নতা।’

১৯২১ সালের জুন মাসে নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ের আয়োজন হয়। তবে বিয়ের রাতেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসেন কবি। এরপর আর কখনো দৌলতপুরে ফেরেননি তিনি। নার্গিসের সঙ্গে এই বিচ্ছেদ নজরুলের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন নার্গিস কবির প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের অসমাপ্ত প্রেম পরবর্তী সময়ে নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে।  দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নার্গিসকে একটি আবেগপূর্ণ চিঠি লেখেন নজরুল। সেখানে তিনি জানান, নার্গিসের প্রতি তাঁর কোনো প্রতিহিংসা, অনুযোগ কিংবা অভিযোগ নেই। বরং অতীতের বেদনাকেই নিজের সাহিত্যসৃষ্টির অন্যতম প্রেরণা হিসেবে দেখেছেন তিনি। নার্গিস নজরুলের জীবনে এক স্থায়ী স্মৃতির অধ্যায়। তিনি তাঁর হারানো প্রেম, কিশোরী প্রেমিকার স্মৃতি এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে, তবু মাঝে মাঝে আশা জাগে কেন/ আমি ভুলিয়াছি ভোলেনি সে যেন/গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে/সে আজো পথ চাহে সাঁঝে।

মানুষটি জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি হারায়নি। গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে কোনো এক প্রিয়জন আজও সাঁঝের আলোয় পথ চেয়ে বসে আছে, এই পরম বিশ্বাসের দোলাচল কবিকে নস্টালজিক করে তোলে।

নজরুলের ভুবনে প্রমীলা

নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসেন কবি। কুমিল্লায় শহরের কান্দিরপাড়ে বীরেন্দ্র কুমার সেনের বাড়িতে ওঠেন তিনি। সেখানে আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। পরে তা প্রেমে রূপ নেয়। কবি আশালতার নাম দেন ‘প্রমীলা’। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার ৬ নম্বর হাজী লেনে তাঁদের বিয়ে হয়। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও প্রমীলাকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন নজরুল। প্রমীলার প্রতি অনুরাগ প্রকাশে কবি ‘বিজয়িনী’ কবিতায় লেখেন- ‘হে মোর রানি! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে/আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণতলে এসে।’ 

প্রমীলা শুধু নজরুলের জীবনসঙ্গীই ছিলেন না, তার সাহিত্যসৃষ্টিরও অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠেন। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও মুগ্ধতা থেকে কবি রচনা করেন ‘বিজয়িনী’, ‘প্রিয়ার রূপ’ ও ‘দোদুল দুল’-এর মতো কবিতা।

বিশিষ্ট কবি ও নজরুল বিশেষজ্ঞ আবদুল হাই শিকদার সম্প্রতি বাসসের প্রধান কার্যালয়ে এসেছিলেন। নজরুল প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি দীর্ঘ আড্ডা দেন। সেখানে তিনি নজরুলের কুমিল্লা অধ্যায় নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য দেন, মন্তব্য করেন। এই আড্ডায় তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা হচ্ছে নজরুলের শহর। একপাশে নার্গিস অপরপাশে প্রমীলা আর মাঝখানে নজরুলের সৃষ্টিশীলতার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে গোমতী নদী। কুমিল্লাকে নজরুলময় শহর বলা হয়। এখানে কবির প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার মূল্যবান স্মৃতি অনেক। কমিল্লা শহর জুড়ে নজরুলের অসংখ্য স্মৃতির ফলক রয়েছে। এ কুমিল্লাতেই তিনি সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি হয়ে ওঠেন। এখান থেকেই কলকাতা ফেরার অল্পসময়ের মধ্যে তিনি লেখেন তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইন্সটিটিউট ঘোষিত নজরুল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরীও মনে করেন, ‘কুমিল্লা অধ্যায় নজরুলের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।’

নজরুল-নার্গিসের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নার্গিসের প্রতি নজরুলের অনুযোগ কিংবা অভিযোগ ছিল না। সেটি তিনি নার্গিসকে লেখা চিঠিতেই উল্লেখ করেছেন। বরং অতীতের বেদনাকেই নিজের সাহিত্যসৃষ্টির অন্যতম প্রেরণা হিসেবে দেখেছেন নজরুল। নার্গিস তাকে বেদনার ‘আগুনের পরশমানিক’ না দিলে তিনি হয়তো ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে কিংবা ‘ধূমকেতু’র বিস্ময় নিয়ে আবির্ভূত হতে পারতেন না- এটি উল্লেখও করেছেন। নার্গিসের কিশোরী রূপটি নজরুলের হৃদয়ে চিরভাস্মর হয়ে ছিল। হারানো প্রেম, কিশোরী প্রেমিকার স্মৃতি এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অনুভূতি নজরুলকে পরিপক্ক করে তুলেছে।’

নজরুল মূলত দ্রোহের কবি হলেও, তাঁর প্রেম ও বিরহের রূপটি সমানভাবে প্রবাদপ্রতিম। ‘গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে’ কুমিল্লার মাটিতে কবির আত্মিক যোগাযোগের এক শৈল্পিক দলিলও বটে। কালের নিয়মে নদী শুকায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু গোমতীর ঢেউয়ে আর নজরুলের সুরের মূর্ছনায় সেই অমর প্রেমের বাঁশরি আজও যেন একই মধুরতায় বেজে যায়।- বাসস

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies