Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষা নিশ্চিত করতে করণীয়

আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষা নিশ্চিত করতে করণীয়

রুমা আক্তার ।। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু মুখস্থ করার নাম নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শিশুর জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও নৈতিক বোধের বিকাশ ঘটানো। একটি শিশু যেন আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে এবং ভুল থেকে নতুন কিছু শিখতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই শিশুবান্ধব শিক্ষার মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর কাছে বিদ্যালয় মানেই পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, নম্বর আর ফলাফলের প্রতিযোগিতা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে শিক্ষাকে আনন্দময় ও জীবনঘনিষ্ঠ করে তোলা এখন সময়ের দাবি।

মুখস্থবিদ্যার বদলে বুঝে শেখার সুযোগ

শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী। তারা চারপাশের জগৎ সম্পর্কে জানতে চায়, প্রশ্ন করে এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নতুন বিষয় শিখতে আগ্রহী হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করা ও পরীক্ষায় নির্দিষ্ট উত্তর লেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে শিশুর চিন্তাশক্তি, অনুসন্ধিৎসা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যথাযথভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না।

তাই শ্রেণিকক্ষে শুধু বক্তৃতা বা পাঠ্যবইনির্ভর পাঠদানের পরিবর্তে গল্প, ছবি, বাস্তব উদাহরণ, দলীয় কাজ, শিক্ষামূলক খেলা ও হাতে-কলমে শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিজ্ঞান শেখাতে ছোট ছোট পরীক্ষা, গণিত শেখাতে দৈনন্দিন জীবনের হিসাব এবং ভাষা শেখাতে গল্প বলা ও লেখার চর্চা কার্যকর হতে পারে। এতে শিশুরা বিষয়বস্তু সহজে বুঝবে এবং শেখার প্রতি আগ্রহী হবে।

পরীক্ষার চাপ কমিয়ে মূল্যায়নে পরিবর্তন

শিশুর মেধা ও যোগ্যতা কেবল পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রত্যেক শিশুর শেখার গতি, আগ্রহ ও দক্ষতা আলাদা। কেউ গণিতে ভালো, কেউ ভাষা বা ছবি আঁকায় দক্ষ, আবার কেউ খেলাধুলা কিংবা দলগত কাজে পারদর্শী। শিক্ষাব্যবস্থায় এসব বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।

নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের কাজ, মৌখিক উপস্থাপনা, প্রকল্প, ব্যবহারিক অনুশীলন ও শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মূল্যায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পরীক্ষাকে আতঙ্কের বিষয় না বানিয়ে শেখার ঘাটতি শনাক্ত ও তা পূরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কোনো শিশু প্রত্যাশিত ফল করতে না পারলে তাকে অপমান বা অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সহায়তা দিতে হবে।

শিক্ষকের ভূমিকা ও প্রশিক্ষণ

শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন, তার কৌতূহলকে উৎসাহিত করেন এবং শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেন। তাই শিক্ষকদের শিশুমনস্তত্ত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং আনন্দভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ থাকতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারবে, ভুল উত্তর দিলেও অপমানিত হবে না এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ পাবে। শারীরিক শাস্তি, ভয় দেখানো, বিদ্রূপ কিংবা সবার সামনে হেয় করার মতো আচরণ পরিহার করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠলে শেখার পরিবেশ আরও কার্যকর হবে।

খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগ

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং অবাধ সৃজনশীল চর্চা অপরিহার্য। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপে এসব কার্যক্রম গুরুত্ব হারায়। অথচ খেলাধুলা শিশুকে শৃঙ্খলা, দলগত সহযোগিতা, নেতৃত্ব ও পরাজয় মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, নাটক ও গল্প লেখার মতো কর্মকাণ্ড তার কল্পনাশক্তি ও আত্মপ্রকাশের দক্ষতা বাড়ায়।

তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সময় নির্ধারণ করতে হবে। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকলে বিদ্যালয়ের খালি জায়গা কিংবা উপযোগী বিকল্প পরিসর ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব কার্যক্রমকে পড়াশোনার বাইরে অপ্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষারই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

অভিভাবকদের প্রত্যাশা ও সহযোগিতা

শিশুর ওপর পড়াশোনার চাপ তৈরির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবারেরও ভূমিকা রয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের ভালো ফলের আশায় অতিরিক্ত কোচিং, প্রাইভেট পড়া ও দীর্ঘ সময় পড়াশোনার রুটিন চাপিয়ে দেন। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা কিংবা প্রত্যাশা পূরণ না হলে বকাঝকা করার ফলে শিশুর মধ্যে ভয়, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

অভিভাবকদের বুঝতে হবে, প্রতিটি শিশুর শেখার ক্ষমতা ও আগ্রহ এক নয়। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার সমস্যাগুলো বুঝতে চেষ্টা করাও জরুরি।

নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদ্যালয়

আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের পরিবেশও হতে হবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও শিশুর উপযোগী। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিশু, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশু এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা যেন সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কোনো শিশুর আর্থিক অবস্থা, শারীরিক সক্ষমতা, ভাষা কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তাকে অবহেলা করা যাবে না। বিদ্যালয়ে বুলিং বা সহপাঠীর মাধ্যমে হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদ বোধ করে এবং প্রয়োজনে শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে সমস্যার কথা জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার হোক প্রয়োজন অনুযায়ী

ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তির ব্যবহার পাঠদানকে আকর্ষণীয় করতে পারে। ছবি, ভিডিও, অ্যানিমেশন ও ইন্টারঅ্যাকটিভ উপকরণের মাধ্যমে জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বই পড়া, খেলাধুলা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। বয়স উপযোগী ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত ডিজিটাল উপকরণ বেছে নিতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং পর্দার সামনে সময় কাটানোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

নীতিনির্ধারণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুবান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠা শুধু একজন শিক্ষক কিংবা একটি বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য শিক্ষা প্রশাসন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিকে শিশুর বিকাশের উপযোগী করা, বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা, শিক্ষকসংকট কমানো এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

একই সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মতামত শোনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোন পাঠদান পদ্ধতিতে তারা ভালো শিখছে, কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশে কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা জানার সুযোগ দিলে শিক্ষার্থীরাও নিজেদের শিক্ষাজীবনের অংশীদার হয়ে উঠবে।

শিক্ষা হোক আনন্দের, ভয়ের নয়

শিশুরা বিদ্যালয়ে যাবে শেখার আনন্দ নিয়ে, পরীক্ষার ভয় নিয়ে নয়। তারা বই পড়বে কৌতূহল থেকে, কেবল নম্বর পাওয়ার জন্য নয়। তাদের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে উঠবে। এটাই হওয়া উচিত শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষা নিশ্চিত করা মানে পড়াশোনার গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমনভাবে শেখার পরিবেশ তৈরি করা, যাতে শিশুরা বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে শেখে। শিক্ষার সাফল্য শুধু কতজন পরীক্ষায় ভালো ফল করল, তা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। বরং শিশুরা কতটা চিন্তা করতে শিখল, কতটা আত্মবিশ্বাসী হলো এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের শৈশবকে চাপ, ভয় ও প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান, আনন্দ, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ, একটি শিশুবান্ধব বিদ্যালয় কেবল ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করে না, বরং গড়ে তোলে আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও মানবিক মানুষ।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies