মিলিয়ন বেলায় ও টিমোথি ওয়াইজ, আলজাজিরা ।।
আফ্রিকায় কৃষির কথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ এখন ঐতিহ্যবাহী খাদ্যশস্যের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে উঠছে। এ বছর কৃষি উন্নয়ন উদ্যোগ ‘এজিআরএ’ (AGRA) প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ নাম আগে ছিল ‘অ্যালায়েন্স ফর এ গ্রিন রেভল্যুশন ইন আফ্রিকা’।
এজিআরএর স্লোগান হলো, ‘টেকসইভাবে আফ্রিকার খাদ্যব্যবস্থার বিকাশ’। তবে বহু বছর ধরেই গবেষক ও কৃষকেরা সতর্ক করে আসছেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রচারিত কৃষিনীতি আফ্রিকার কৃষির জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণাতেও সেই আশঙ্কার আরও প্রমাণ মিলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যাপক ব্যবহারকে উৎসাহিত করে এজিআরএ যে ‘সবুজ বিপ্লব’ এগিয়ে নিচ্ছে, তা প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতিশ্রুত সেই কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা বিপ্লব ঘটাতে পারেনি।
বরং ভুট্টার মতো একক ফসলের চাষকে উৎসাহিত করার ফলে এসব ফসলের আওতায় জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর বিপরীতে জলবায়ু সহনশীল ও পুষ্টিকর স্থানীয় ফসল, বিশেষ করে বাজরা, ক্রমেই চাষের জমি হারাচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী ফসল হারানোর পেছনে ভর্তুকি
জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, সংঘাত এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাবে আফ্রিকায় ক্ষুধা ও খাদ্যসংকট বাড়ছে। কিন্তু এজিআরএ যে সবুজ বিপ্লবের কথা বলে আসছে, তা এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।
যেসব দেশে এজিআরএর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে, সেখানে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। পুরো আফ্রিকা মহাদেশেও প্রায় একই হারে এই সংখ্যা বেড়েছে।
জাতিসংঘ এখন ‘সবার নাগালের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্য’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আফ্রিকার ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এর অর্থ হলো আরও বেশি ফসলের বৈচিত্র্য, কম নয়। কারণ এসব কৃষক নিজেদের পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতেই মূলত বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। অথচ সবুজ বিপ্লবের বর্তমান ধারা ফসলের বৈচিত্র্যের ঠিক বিপরীত দিকে যাচ্ছে।
এজিআরএর বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নেওয়া দেশগুলোতে ভুট্টার মতো ফসল চাষে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ও বিনিয়োগ করা হয়েছে। তারপরও ১৮ বছরে এসব দেশে ভুট্টার উৎপাদনশীলতা বেড়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। এজিআরএর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুত ১০০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির তুলনায় এটি অনেক কম।
অবশ্য মালাউই ও ইথিওপিয়ার মতো কিছু দেশে ভুট্টার উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। আবার এজিআরএর সদর দপ্তর যে কেনিয়ায়, সেখানে ভুট্টার উৎপাদনশীলতা কমেছে।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোতে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে মূলত এর চাষের জমি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কারণে। সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পেতে কৃষকেরা নতুন নতুন জমিতে ভুট্টা চাষে ঝুঁকেছেন।
অন্যদিকে জোয়ার, কাসাভা ও চিনাবাদামের মতো আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যশস্য জমি ও বিনিয়োগ দুটোই হারিয়েছে। ২০০৬ সালে এজিআরএ যাত্রা শুরুর পর থেকে এর কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ১৩টি দেশে কাসাভার উৎপাদনশীলতা মোট ২১ শতাংশ এবং চিনাবাদামের ১০ শতাংশ কমেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাজরা।
২০০৬ সালের আগে এসব দেশে ভুট্টার মতোই ব্যাপকভাবে চাষ হতো বাজরা। কিন্তু এরপর বাজরার উৎপাদন ২৭ শতাংশ কমে গেছে। বিপরীতে ভুট্টার উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বিনিয়োগের অভাবে বাজরার উৎপাদনশীলতা কমেছে ১৭ শতাংশ। একই সময়ে ভুট্টার জমি ৭১ শতাংশ বেড়েছে, আর বাজরার জমি কমেছে ১২ শতাংশ।
বাজরা কোনো ‘পিছিয়ে থাকা’ ফসল নয়
বাজরাকে এমন কোনো পুরোনো বা অনুন্নত ফসল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, যাকে ভুট্টার জায়গা করে দিতে হবে। আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলগুলোর মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এই ফসল।
তীব্র তাপ ও খরা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে বাজরার। খুব বেশি বাইরের উপকরণ ছাড়াই এটি চাষ করা যায়। এমন অনেক জায়গায়ও এটি পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দিতে পারে, যেখানে অন্যান্য ফসল টিকে থাকতে হিমশিম খায়।
২০২৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও ‘আন্তর্জাতিক বাজরা বছর’ পালন করে। এতে পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণে বাজরার বহুমুখী গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
একই কথা আফ্রিকার আরও অনেক ঐতিহ্যবাহী ফসলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জোয়ার, ফনিও, কাউপিয়া, কাসাভা, স্থানীয় শাকসবজি এবং আরও বহু ফসল শুধু কৃষিপণ্যের তালিকায় থাকা কিছু নাম নয়। এগুলো আফ্রিকার কৃষিজীববৈচিত্র্যের অংশ। একই সঙ্গে এগুলো স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জ্ঞান, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এসব ফসলকে কৃষি থেকে সরিয়ে দেওয়া আরও বেশি অযৌক্তিক। কৃষকের প্রয়োজন তাদের জমিতে আরও বেশি বিকল্প, কম নয়। একটি বৈচিত্র্যময় খামার কৃষকের ঝুঁকি কমায়। কোনো একটি ফসল খরা, রোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য কোনো ফসল টিকে যেতে পারে। ফসলের বৈচিত্র্য ও পর্যায়ক্রমিক চাষ মাটির উর্বরতাও ধরে রাখতে সহায়তা করে।
ফসলের বৈচিত্র্যের মূল্য
বর্তমানে এজিআরএ তাদের বক্তব্যে সেই ফসলগুলোর গুরুত্বের কথাই বলছে, যেগুলোকে তাদের সবুজ বিপ্লবের নীতিই একসময় প্রান্তিক করে তুলেছিল। প্রতিষ্ঠানটি এখন বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও জলবায়ু-সহনশীল ফসলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে। তাদের বীজ কর্মসূচিতেও বাজরা, জোয়ার, কাউপিয়া, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন ফসল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসব ফসলে বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এজিআরএ এবং সবুজ বিপ্লবের অন্যান্য সমর্থক প্রতিষ্ঠানগুলো কি ভুট্টার মতো নির্দিষ্ট কিছু একক ফসলের ওপর নির্ভরতা সত্যিই কমাবে?
এজিআরএর বর্তমান বীজ কৌশলেও উন্নত জাত, প্রত্যয়িত বীজ, দ্রুত জাত পরিবর্তন, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বাজারনির্ভর বীজব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রয়োজন এমন বিনিয়োগ, যা কৃষকদের নিজেদের বীজ সংরক্ষণ, ব্যবহার, বিনিময় ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় কৃষিজ্ঞান রক্ষা করতে হবে। কোন জাত টিকে থাকবে এবং কোনটি বিস্তার লাভ করবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু বীজের বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কৃষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
আফ্রিকার কৃষকদের ‘উদ্ধার’ করার প্রয়োজন নেই। বরং তাদের ঐতিহ্যবাহী ফসলগুলোকে রক্ষা করা প্রয়োজন। বাজরা, জোয়ার, কাউপিয়া, ফনিও এবং অন্যান্য স্থানীয় ফসলকে এমন কৃষিব্যবস্থার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট ফসলের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কোনো ঐতিহ্যবাহী ফসল যখন কৃষকের জমি থেকে হারিয়ে যায়, তখন শুধু একটি ফসলই হারায় না। হারিয়ে যেতে পারে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বীজের জাত, সেই ফসল চাষের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জ্ঞান, তা সংরক্ষণ ও রান্নার পদ্ধতি এবং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ কারণেই বাজরার পতন শুধু বাজরার জমির সমস্যা নয়। এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য ও সারবাজারের অস্থিরতার কারণে আফ্রিকা এমনিতেই বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষির বৈচিত্র্যই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাগুলোর একটি।
অথচ সেই বৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়ার পথেই ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
শুধু পুষ্টিকর খাদ্যে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। আফ্রিকার বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ মানুষ, যারা একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের জন্য খাদ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে ফসলের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।
এ জন্য এজিআরএ, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বিদেশি দাতা সংস্থা এবং আফ্রিকার সরকারগুলোর উচিত এমন ফসলের ওপর ভর্তুকি ও বিনিয়োগের নীতি পুনর্বিবেচনা করা, যার ফলে ঐতিহ্যবাহী ও স্থানীয় ফসলের বৈচিত্র্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

