মুসলিম ইবনে রবি, জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
“বেকারত্ব রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় পুঁজি”
একজন বেকারই জানে বাস্তবতা কতটা নির্বিকার। আমাদের সমাজে বেকার হলো সেই মানুষ যার অর্থ উপার্জনের নেই কোন সক্ষমতা অথবা সুযোগ।
আমার প্রথম কথা”বেকারত্ব রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় পুঁজি”এটি শুনে কারো মনে জন্মেছে কৌতুহল, কারোরই বা তীব্র বিতৃষ্ণা।তবে শুনে প্রতিবাদ করার যে মানসিকতা তা একেবারেই অগ্রাহ্য করার কোন উপায় নেই।
আমার কোন পাঠকের মনে হয়তো এই প্রশ্ন জাগতে পারে- আমার এই শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ কেনইবা রাজনীতিবিদদের কুটকৌশল আর বেকারদের নির্বুদ্ধিতার দিকে তীর ধরে রেখেছে। তবে আসুন-বসুন আর উপলব্ধি করুন। বেকারের ঘাড়ে এই জগতের ভার। একজন বেকার প্রতিনিয়ত বহু কাজ করে থাকে। তবে তা কাজ বলে গণ্য হয় না। কারণ তার কৃতকাজ থেকে কোন উল্লেখযোগ্য উপার্জন আসে না। মানুষের হাস্যরসের পাত্রে কিংবা তাচ্ছিল্যের উপমায় অতি সহজে একজন বেকার আসন পেয়ে যায়।নিত্য উপেক্ষার শিকার বেকার ব্যক্তিটির মনে উদিত হয় জগৎজয়ের ভাবনা।
সে চিন্তা করে হঠাৎ তার কাছে চলে আসবে অঢেল অর্থ-কড়ি, নতুবা কোন এক সাম্রাজ্য যেখানে শুধু তারই কর্তৃত্ব চলবে।তবে হায়! বেকারের এই দিবাস্বপ্ন তার শ্রম এবং সময় উভয়ই নষ্ট করে। পরিশেষে পরিতোষের উপায় না পেয়ে একজন বেকার তার সম্রাজ্য স্থাপনের চিন্তা বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র অন্ন সংস্থানের চিন্তা শুরু করে । তার এই চিন্তার বাস্তব কর্মকাণ্ডের রূপকার হিসেবে আবর্তন ঘটে একজন নেতার। সুকৌশলী নেতারা জানেন অল্প কিছুর বিনিময়ে অতি সহজে এ সকল বেকারদের কলুর বলদের মতো ইচ্ছামতো খাটানো যাবে। নেতারা তখন বেকারদের ক্ষমতার লোভ দেখানো শুরু করে ।
দিকহারা বেকার, নেতার দেখানো আলোর দিশারী পেয়ে নিজেকে নেতার সম্মানে উৎসর্গ করাকে অতি উত্তম কর্ম বলে ধরে নেয়। তখন নেতারা বেকারদের সামান্য কিছু আপ্যায়ন করা শুরু করে এই ধরুন চা-সিঙ্গারা কিংবা এক ঢোক কোক। অতীতে শাস-বাতাসার প্রচলন থাকলেও বিবর্তনের ধারায় এখন তা মিষ্টিতে এসে পৌঁছেছে। নেতার হাতের একটি মিষ্টি বেকারের কাছে অমৃত সমতুল্য। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে আসুন আমরা বাস্তব জীবনে একটু ফিরে আসি।
পারিবারিক টানপরণ সহসা থাকলেও খুব কম বেকারের কপালে বউ জোটে। পারিবারিক টান কম কিংবা পরিবারের উপর বিতৃষ্ণা থাকায়, অভিভাবক হিসেবে নেতাকেই হর্তাকর্তা মেনে নিয়ে বেকাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে নেতার যেকোনো নির্দেশে। নেতারাও কম সেয়ানা নয়, দু-একটা বেকার আক্কা পেলে যে বেকার সমুদ্র থেকে এক ফোটা জলও কমবে না তারা তা ভালোভাবে জানে । এভাবে বেকাররা ধীরে ধীরে নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠে, ব্যবহার শেষে নেতারা পুরাতন হাতিয়ার ফেলে নতুন হাতিয়ার তুলে নেয়। নেতাদের কিন্তু এত দোষারোপ করলে চলবে না। বেকারত্ব দূরীকরণে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করে যায়।
এই ধরুন মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু হাতে-কলমে শিক্ষা। যে শিক্ষা গ্রহণ করে লাখে একটি বেকার সফল হয়।সফল হওয়া বেকারকে নিয়ে শুরু হয় প্রচারণা, বহুকাল ধরে চেষ্টার পরে কালো গরু থেকে একটি সাদা বাছুর হয়েছে। চারটে খানি কথা নয়।”মধু নাহি জানে তাহার গুণ “বেকারদের নিয়ে নেতার ভাবনার অন্ত নেই। যত বেশি বেকার তত বেশি কর্মী। বেকার সংকট নেতার কাম্য নয়।নেতারা তাদের নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য তাদের বেকার ভান্ডার প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে থাকে। একজন সুশিক্ষিত আত্মনির্ভরশীল ব্যক্তি নেতাদের জন্য গলার কাঁটার মতো।এজন্য নেতারা সর্বপ্রথম হাতে দেয় শিক্ষা ব্যবস্থায়। যত ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা, যত বেশি বিতর্কিত মান নির্ণয় তত বেশি বেকার উৎপাদন। নেতারা উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা বেশি একটা পছন্দ করে না। তারা পছন্দ করে না তার একজন কর্মী একজন নেতা হয়ে উঠুক। একজন কর্মী হয়ে উঠুক আত্মসমালম্বী। নেতার কৌশলী চিন্তাধারা সময়ের সাথে উন্নত হলেও, পরিবর্তনের মানসিকতা সেই সনাতনী। “লোহার জাহাজ ডুবলেও, শুকনো কাঠটুকু যে আশ্রয়। “আশ্বাস নেতাদের আরেকটি কুটকৌশল “। বেকারদের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই প্রদীপে রুটি সেকে দিব্যি উদারপূর্তি করতে থাকে জনপ্রিয় নেতারা।
আবার দেখা যায় কখনো তা চাকরি দেওয়ার প্রত্যাশা, কখনো বা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর লোভ দেখানো। নেতারা প্রতিনিয়ত বেকারদের মনে একটু একটু করে তাদের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নেয়। এরপর শুরু হয় স্বার্থ হাসিলের পালা।
নেতার একান্ত পালিত কর্মীরা অনায়াসে নিজেদের আত্মবিসর্জন দেয়, পীরের কাছে মুরিদ যেমন লুটাই তার সর্বস্ব। এভাবে নেতারা টিকিয়ে রাখে তাদের নেতৃত্ব। বেঁচে থাকে শত বেকারের হৃদয়ের মধ্যমণি হয়ে।বেকার যন্ত্রের খল-খল শব্দ সমাজের যন্ত্রণা বাড়ালেও নেতার বহনে তা এনে দেয় জীবনী শক্তি। এভাবেই নেতারা বেঁচে থাকে জনকল্যাণের সারথী হয়ে আপামর জনসাধারণের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে।

