মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অভিযান অপারেশন বাহাদুরাবাদ ঘাট। এই অভিযানের অ্যাসল্ট কমান্ডার ছিলেন লে. কর্ণেল এসআইএম নুরন্নবী খান বীরবিক্রম। অভিযানে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন দেলোয়ার মাস্টার। নিজের ঘরকে তিনি করে তুলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অপারেশন বাহাদুরাবাদের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরন্নবী খান বীরবীক্রম, মেজর শাফায়েত জামিল তার ঘরকেই বেছে নিয়েছিলেন নিরাপদ হিসাবে। দেলোয়ার মাস্টার পুরো বাহিনীকে দুটো গরু জবাই দিয়ে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা ও সেখান থেকে নিরাপদ প্রস্থানের জন্য সর্বতোভাবে তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। যুদ্ধের সেই সময়ে এটি ছিল নিছক আতিথেয়তা নয়, ছিল নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
নুরন্নবী খান বীরবিক্রমের স্মৃতিচারণে দেলোয়ার মাস্টারের ভেতরের মানুষটিকেও যেন দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা যখন তাঁর বাড়ি থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “স্যার, যত দ্রুত সম্ভব দেশকে শত্রুমুক্ত করবেন।”
কয়েকটি শব্দের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে যায় একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ আকাঙ্ক্ষা। তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেননি, তাঁদের মধ্যে নিজের স্বাধীনতার স্বপ্নও সমর্পণ করেছিলেন। তাঁর ঘর ছিল আশ্রয়ের জায়গা, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের ভেতর তখন একটি স্বাধীন দেশের অপেক্ষা।
সেই অপেক্ষার মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার পর পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু দেলোয়ার মাস্টারের মুক্তিযুদ্ধের গল্প ওই একটি অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়। সেটি ছিল তাঁর দীর্ঘ নয় মাসের ভূমিকার একটি খণ্ডচিত্র।
প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান দেলোয়ার মাস্টার সম্পর্কে তাঁর আরও অসংখ্য ভূমিকার কথা বর্ণনা করেছিলেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেলোয়ার মাস্টার কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে ছিলেন, তার স্মৃতি একাধিক সূত্রে ছড়িয়ে আছে।
লে. কর্ণেল নুরন্নবী খান বীরবিক্রমের সেই লেখার শেষদিকে ছিল একটি আক্ষেপ—স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সম্ভবত দেলোয়ার মাস্টারের নাম থাকবে না। একজন যোদ্ধার চোখে দেখা একজন সহযোগী মানুষের জন্য এই আশঙ্কা ছিল বেদনাদায়ক। আজ দেলোয়ার মাস্টার আর নেই; কিন্তু সেই আক্ষেপটি রয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন এমন মানুষ, যাঁরা সম্মুখসমরে অস্ত্র হাতে নেননি, কিন্তু যুদ্ধকে এগিয়ে নিতে নিজেদের সর্বস্ব ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। তাঁরা আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, খবর পৌঁছে দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের চলার পথ সহজ করেছেন। তাঁদের ঘর কখনো হয়ে উঠেছে অস্থায়ী ক্যাম্প, কখনো আশ্রয়স্থল, কখনো যুদ্ধের গোপন ঠিকানা।
দেলোয়ার মাস্টারের জীবন সেই ইতিহাসেরই একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
তিনি সম্প্রতি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়তো তাঁর প্রাপ্য সব সম্মান তিনি পাননি। মৃত্যুর পরও তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরেকটি বেদনার ঘটনা। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের উদ্যোগে কিছু মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্মান। জীবনের নানা মতভেদ, সংগঠনের ভিন্নতা কিংবা অন্য কোনো বিরোধ থাকলেও একজন মৃত মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় যেন বিরোধের জায়গা না হয়ে ওঠে, এটুকু মানবিক প্রত্যাশা নিশ্চয়ই করা যায়।
দেলোয়ার মাস্টার এখন আর নিজের পক্ষে কিছু বলবেন না। তাঁর হয়ে কথা বলবে সেই সময়ের স্মৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র।
কথা বলবে সেই দৃশ্যও, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব দেশকে শত্রুমুক্ত করার কথা।
কথা বলবে তাঁর পুড়ে যাওয়া বাড়ি।
কথা বলবে তাঁর ঘরে আশ্রয় নেওয়া যোদ্ধাদের স্মৃতি।
অপারেশন বাহাদুরাবাদ ঘাট তাই দেলোয়ার মাস্টারের গল্পের শেষ নয়; বরং তাঁর মুক্তিযুদ্ধের গল্পের একটি জানালা। সেই জানালা দিয়ে দেখা যায় একজন মানুষকে, যিনি নিজের ঘরকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন এবং নিজের ভেতরে ধারণ করেছিলেন স্বাধীন দেশের স্বপ্ন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষ বিদায় নিয়ে যে আক্ষেপ তৈরি হয়েছে, সেটিও হয়তো একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তাঁর জীবনের যে অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত, সেটি যেন বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
