স্টাফ রিপোর্টার:
শাস্তি, বরখাস্ত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরের পর সরকার পরিবর্তন হলে কর্মকর্তাদের আবার চাকরিতে ফিরিয়ে আনার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তী সরকার এসে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করার নজির রয়েছে। এতে প্রশাসনে যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুকূল্যই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
সর্বশেষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালের জুনে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং কারও বেতন কমানো হয়। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশে তাদের শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১ জুলাই সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া ও বরখাস্ত ১৫০ কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর কিংবা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয় সরকার। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পাবেন।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপপুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান খানের বরখাস্তের আদেশ ১১ বছর পর গত ৬ আগস্ট বাতিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সরকার বদলালে বদলায় শাস্তির সিদ্ধান্ত
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও আওয়ামী লীগ আমলে চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করা হয়। ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বরখাস্ত হওয়া ৮৫ নির্বাচন কর্মকর্তাকেও ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে চাকরি হারানো ১ হাজার ৫২২ পুলিশ সদস্যকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে নৈতিক স্খলন, আর্থিক দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে ফৌজদারি মামলা থাকা ব্যক্তিদের এ প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়নি।
অন্যদিকে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর ও বিভিন্ন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। জুলাইয়ের শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ৩২ যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পুলিশ প্রশাসনেও একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনে কী বার্তা যাচ্ছে?
জনপ্রশাসন ও আমলাতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তি দেওয়া এবং পরে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই শাস্তি বাতিলের প্রবণতা প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে যেকোনো শাস্তি পরবর্তী সময়ে বাতিল করা সম্ভব।
সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলেন, সব সরকারের সময়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে সরিয়ে দেওয়া হলে সরকার পরিবর্তনের পর তার ফিরে আসার পথ তৈরি হয়। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফিরিয়ে আনলে তা রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যকে আরও শক্তিশালী করে।
তার মতে, কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি, অসদাচরণ বা অন্যায় করলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শোকজ, তদন্ত কমিটি এবং গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন কম থাকে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, কোনো কর্মকর্তাকে বিভাগীয় মামলায় দণ্ড দেওয়া হলে তার আপিল বা রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে। দণ্ড বহাল থাকলে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগে যাওয়ারও সুযোগ থাকে। এসব আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফিরিয়ে এনে পদে বসানো অনিয়ম।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া ব্যক্তিরাই সাধারণত এ ধরনের সুবিধা পান। ফলে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ বন্ধ হচ্ছে না। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা কঠিন হবে।




