নিজস্ব প্রতিবেদক
গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায়ের ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ চট্টগ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে দাবি আদায়ে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে জোটটি। অন্যদিকে, সরকারবিরোধী কর্মসূচির নামে অরাজকতা সৃষ্টি করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে সাড়ে ১৪ ঘণ্টা। পথে পাঁচটি পথসভা করে জোটের নেতারা। এসব কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে শুরুতে পাঁচ হাজার গাড়ি নিয়ে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে এক হাজার গাড়ি করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচশ থেকে পৌনে ছয়শ গাড়ি ঢাকা থেকে যাত্রা করে বলে জানা গেছে। কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি যুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রামে বহরের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
লংমার্চ ঘিরে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ও পুলিশ প্রটোকলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া এবং যান চলাচলে প্রশাসনের সহযোগিতার কারণে কর্মসূচিটি নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে লংমার্চের দিন রাজধানীতে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিরোধী জোটের কর্মসূচি প্রসঙ্গে সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচিত সরকার হিসেবে প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা উচিত।
বিরোধী জোটের ছয় দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার, জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেনীর পথসভায় বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দাবিগুলো মেনে না নিলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। চট্টগ্রামের সমাবেশে তিনি নেতাকর্মীদের ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চের প্রস্তুতি রাখারও নির্দেশ দেন।
এদিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের দাবি সংসদে সমাধান না হলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। আগামী অধিবেশনে বিরোধী দল সংসদে থাকবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানান তিনি।
সংবিধান সংস্কারই মূল জটিলতা
বিরোধী জোটের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। জুলাই সনদে সংবিধানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংবিধান সংশোধনে নতুন কাঠামো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের মতো বিষয় রয়েছে।
এসব সংস্কারের অধিকাংশ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান কাছাকাছি হলেও উচ্চকক্ষ গঠন, সাংবিধানিক পদে নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্বের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও এর কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিরোধী জোট সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, জুলাই আদেশ তারা পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। তবে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিরোধী দল ওই কমিটিতে প্রতিনিধি দিতে রাজি না হওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ার শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গেলে সরকার ও বিরোধী দলের দূরত্ব অনেকটাই কমতে পারে। সংসদে বিরোধী দলের দাবি উত্থাপন ও আলোচনার সুযোগ থাকলেও রাজপথে বড় কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদের মাত্র সাত মাসের মধ্যে সরকার পতনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও মুখোমুখি করে তুলতে পারে।
তাই রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে সরকারকে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। পাশাপাশি বিরোধী দলকেও সংসদীয় রাজনীতি ও রাজপথের কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য রেখে দাবি আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরও
শর্টটাইমের লংমার্চ, পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি
Oplus_131072
React:




