গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান ও প্রতারিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।সরকারের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের কবর রচনা করে সংসদের ভেতরেই সবকিছুর ফয়সালা করতে। আমরা রাজপথে আসতে চাইনি। কিন্তু আপনারাই আমাদের এখানে আসতে বাধ্য করেছেন।’তিনি বলেন, ছয় দফা ১১ দলের কোনো ব্যক্তিগত দাবি নয়, এগুলো দেশের জনগণের দাবি। জনগণের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।এর আগে শনিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা জনগণের জন্য রাস্তায় নেমেছি, জনগণের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব ইনশাআল্লাহ।’অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি মেনে নিতে সরকারকে চাপ দিতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে এ লংমার্চ কর্মসূচি পালন করে। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও তিন বিভাগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। এরপর সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।লালদীঘির সমাবেশে শফিকুর রহমান আরও বলেন, সরকারি দলের লোকেরা চুরি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের কেউ কেউ ধরা পড়ার পর নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক বলে পরিচয় দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় গুপ্তভাবে অবস্থান করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা যখন লংমার্চের ডাক দিয়েছি, বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়; এটি জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।’বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আগের সরকার যে রাস্তায় বিদায় নিয়েছে, বিএনপিও সেই রাস্তায় হাঁটতে চায় কি না, তা জনগণ দেখবে।চট্টগ্রামের মেয়র প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘এই মেয়র মেয়াদোত্তীর্ণ। এর নাম কী? এটা হচ্ছে ফ্যাসিবাদ।’ তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা করেছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করবেন। এখন যাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে, তারা কি নির্বাচিত?তিনি আরও বলেন, আজকের লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য। পরবর্তী কর্মসূচিগুলো এ রকম হবে না। আন্দোলনে নিহত ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি বিরোধী দল দায়বদ্ধ। বিরোধী দলকে লোভ বা টোপ দিয়ে কেনা যাবে না। খুব শিগগিরই বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। সেই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদ, অপরাধী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও আধিপত্যবাদীরা পরাজিত হবে।বিগত আন্দোলনের শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করে তিনি বলেন, আন্দোলনে বিপুল মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে গুম হয়েছেন এবং আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পর নিজেদের ‘শিশু সরকার’ দাবি করা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয়নি; তারা প্রাপ্তবয়স্ক বিবেচনা করেই ভোট দিয়েছে।সরকারকে হুঁশিয়ার করে তিনি বলেন, ‘সরকার একের পর এক উল্টাপাল্টা কাজ করবে আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে—তা হতে দেওয়া হবে না। এখন পর্যন্ত তাদের আঙুল সোজা রয়েছে, প্রয়োজনে তা বাঁকা করতে দ্বিধা করা হবে না।’‘সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রী দায়ী’সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের বর্তমান সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়ী। তিনি সংসদকে কার্যকর করলে এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে বিরোধী দলকে রাজপথে নামতে হতো না।তিনি বলেন, ‘তিনি সংসদকে অকার্যকর করে রাখায় আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।’নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন কথা বলা বন্ধ রেখেছেন। মাঝেমধ্যে কথা বললেও ভুল বলেন। এ কারণে সালাহউদ্দিন আহমদকে কথা বলার জন্য রাখা হয়েছে—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশের জনগণ তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ও তাকে বয়কট করেছে।তিনি বলেন, দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট চলছে। সরকার সবদিক থেকে ব্যর্থ হয়েছে। সময় থাকতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে দেশ পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করতে হবে। অন্যথায় সরকার পরিবর্তনের জন্য জনগণ পাঁচ বছরও অপেক্ষা করবে না।‘বিএনপি সরকারের পরিবর্তন চায় জনগণ’সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশের মানুষ বিএনপি সরকারের পরিবর্তন চায়। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হয়ে চিরদিনের জন্য চলে যাক।সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সব জায়গায় দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকারের সঙ্গে বাকশালের কোনো পার্থক্য নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে ভোট চেয়েছিল। এখন তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।ব্যাপক জনসমাগমশনিবার দুপুর থেকেই চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা লালদীঘি ময়দানে আসতে শুরু করেন। বিকেল ৩টার আগেই সমাবেশস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।সমাবেশকে কেন্দ্র করে লালদীঘি ময়দান ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সমাবেশ শেষ হয়।এর আগে শনিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরু হয়। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।যাত্রাপথে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব পথসভায় ১১ দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর পর্যায়ক্রমে ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।ছয় দফা দাবি১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা
ছয় দফা না মানলে সরকার পতনে এক দফার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি।
React:




