ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিকের কাছে ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক জেনারেল গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন তাঁর বিরোধী শিবিরের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার লড়াই। কিন্তু দেশটির মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের কাছে এই নির্বাচন হাজির করেছে ভিন্ন এক সংকট।
ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতি ক্রমেই চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অধিকার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছে। দেশটির ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংসতা বাড়ছে, পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীরা এসব এলাকার সীমানা অতিক্রম করে নিজেদের অবস্থান বিস্তৃত করছে। বেসামরিক জীবনে পুলিশি তৎপরতা ও সামরিকীকরণ বাড়ানোর সাম্প্রতিক উদ্যোগও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের কাছ থেকেও নীতিগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা করার বিশেষ কারণ নেই। ফলে অনেক ফিলিস্তিনির মনে প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিয়ে আদৌ কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না।
১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনে পুনরায় উপনিবেশ বিস্তারের প্রক্রিয়া
১৯৪৮ সালের নাকবার পর যেসব ফিলিস্তিনি তাঁদের বাড়িঘরে থেকে যেতে পেরেছিলেন, সেসব এলাকা পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষিত হয়। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের তুলনায় তাঁদের পরিণতি ছিল ভিন্ন। ১৯৫২ সালে তাঁরা ইসরায়েলের নাগরিকত্ব পান। এরপর ১৯৬৬ সালে তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।
ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট দেওয়া ও রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব তাঁদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনি পরিচয় ও জাতীয় সংহতি ভেঙে দেওয়ার বৃহত্তর প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষা দিতে পারেনি।
ভূমি দখল এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসরায়েলি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক শিকড় ও সামষ্টিক অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে। এর পরিবর্তে তাদের সামনে এমন এক ‘আরব ইসরায়েলি’ পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে একজন নাগরিকের পরিচয়কে তাঁর ফিলিস্তিনি ও আরব জাতীয় পরিচয় থেকে আলাদা করে দেখা হয়।
আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা প্রকৃত সমতা অর্জন করতে পারেননি। বৈষম্যমূলক আইন, মৌলিক সেবায় দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রান্তিকীকরণের শিকার হচ্ছেন তাঁরা।
পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েল যেভাবে সরাসরি সহিংসতা চালিয়েছে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ক্ষেত্রে সেখানে রাষ্ট্র যেন অপরাধী চক্রগুলোর হাতে সহিংসতার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে।
ফলে ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। অথচ ইসরায়েলি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব সমস্যা মোকাবিলায় অধিকাংশ সময়ই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোর হাতে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছেছে, যেগুলোর কিছু ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অস্ত্রভান্ডার থেকে চুরি করা হয়েছে বলে খবর রয়েছে। কিছু অস্ত্র সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমেও এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরাধী চক্রগুলোর এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা ইতিমধ্যে শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি জনপদের পাশেই ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ভূমি দখলের তৎপরতা। এই পুনরায় উপনিবেশ বিস্তারের প্রক্রিয়া ২০২১ সালে জাফা ও লিদের মতো মিশ্র জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সে সময় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনিদের পাড়ায় নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে শুরু করে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। গত আগস্টে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ তাঁর দলের এমন একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, যার লক্ষ্য নেগেভ ও উত্তর ইসরায়েলকে ‘ইহুদিকরণ’ করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দুই অঞ্চলে আরও ১০ লাখ ইহুদি বাসিন্দা যুক্ত করা হবে, ৪০টি নতুন বসতি ও কয়েক ডজন খামার গড়ে তোলা হবে, বিদ্যমান বসতি সম্প্রসারণ করা হবে এবং কয়েক লাখ নতুন আবাসন ইউনিট নির্মাণ করা হবে।
এর মধ্য দিয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে যে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের মডেল প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নেগেভ ও উত্তর ইসরায়েলেও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ এই দুই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের উল্লেখযোগ্য বসতি রয়েছে।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোর পুলিশি নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের অধীন প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল গার্ডের হাতে চলে যেতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
২০২১ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা ও অধিকারের দাবিতে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা থেকেই এই বাহিনী গঠনের ধারণা আসে। ‘ডিগনিটি অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত ওই আন্দোলন লিদ, হাইফা, উম্ম আল-ফাহমসহ বহু ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বেন-গভির এ ধরনের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ন্যাশনাল গার্ডের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কার্যক্রমের কাঠামো এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত না হলেও বড় ধরনের বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকার বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা দলগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং বৃহত্তর নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি জনপদগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা বাড়ছে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
একই সময়ে বেন-গভির ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র রাখার সুযোগও সম্প্রসারিত করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি তিন লাখ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছেন।
এই পদক্ষেপগুলো সম্মিলিতভাবে বেসামরিক জীবনে পুলিশি ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক করে তুলছে। একই সঙ্গে এমন এক সমাজে বলপ্রয়োগের ক্ষমতার অসম বণ্টন আরও গভীর হচ্ছে, যে সমাজের কাঠামোই ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও অধস্তন করে রাখার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মধ্যে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আম দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে চরম ডানপন্থাকে ক্ষমতা থেকে সরানো ও বসতি সম্প্রসারণের ঔপনিবেশিক কর্মসূচি থামানো সম্ভব। কিন্তু দলটির অতীত অভিজ্ঞতাই এই ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
২০২১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল রা’আম। কিন্তু সেই সরকার ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। জোটটি ছিল দুর্বল এবং এর শরিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত বিরোধ প্রায়ই প্রকাশ্যে এসেছে।
২০২২ সালে রা’আমের সদস্য মাজেন ঘনাইম প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তাঁর দল সরকারে থাকা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের উপকারে আসবে এমন নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও তিনি এসব নীতি বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে গেলে তাঁকে যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, সে কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ওই জোট সরকারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বজায় রাখা কতটা কঠিন, যখন সরকারে থাকা অন্য দলগুলো এমন জাতীয়তাবাদী নীতিকে সমর্থন করে, যা ফিলিস্তিনিদের বাদ দেওয়ার পথ তৈরি করে।
সুতরাং সমস্যাটি শুধু নেতানিয়াহুকে ঘিরে নয়। নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দিলেই ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে চলমান বৈষম্য ও উচ্ছেদের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ভোট দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রকল্পের গতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলি সমাজে যে গভীর পরিবর্তন ঘটছে, তা উল্টে দেওয়া শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে সাংস্কৃতিক ঝোঁক কেবল সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ক্রমেই সামাজিক মনোভাব ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
তারপরও আমার বিশ্বাস, চরম ডানপন্থিদের শাসন আরও চার বছর অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিনি জনপদ ও তাদের অধিকারের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হবে। সে কারণেই মঙ্গলবারের নির্বাচনে আমি ভোট দেব।
তবে ফিলিস্তিনিদের উপলব্ধি করতে হবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আরও মৌলিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যে কাঠামো ও মতাদর্শ এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেগুলোর মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের হাই ফলো-আপ কমিটিকে সংস্কার করা এবং জনপ্রিয় কমিটি ও তৃণমূলের সংগঠনের মাধ্যমে একে ফিলিস্তিনি সমাজের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা জরুরি।
ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনজুড়ে গণতান্ত্রিকীকরণ ও জায়নবাদমুক্ত করার বৃহত্তর অঙ্গীকারও প্রয়োজন। বিকল্প প্রতিষ্ঠান, কার্যকর ব্যবস্থা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের নতুন পথ তৈরি করে ভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হতে হবে এসব উদ্যোগকে।
ইসরায়েল রাষ্ট্র যা-ই দাবি করুক না কেন, দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বাকি অংশের ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতাদের এই বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করতেই হবে।




