সীমিত আয় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা। এ অবস্থায় মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদনের পর বেসরকারি খাতেও বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মালিকপক্ষও এ উদ্যোগে সম্মতি জানিয়েছে। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের পরও রাজধানীর উত্তরায় শ্রমিক আন্দোলন ও কয়েকটি কারখানা বন্ধের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আমার দেশ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে- রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতের রপ্তানি আয় প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতে পোশাক রপ্তানি থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে শিল্পটি।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বড়, মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পোশাক কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তাঁদের প্রায় ৬২ শতাংশ নারী। ফলে নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনেও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠনে মালিকদের সম্মতি
২০১৮ সালের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তখন মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ মজুরি বেড়েছিল ৪ হাজার ৫০০ টাকা বা ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার আবারও মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি মাসেই নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, শ্রম সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদার, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
গত ১৫ অক্টোবর নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য সদস্য মনোনয়নের আহ্বান জানায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত বোর্ডে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে।
তবে মালিকপক্ষের অভিযোগ, মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত জানানোর পর ১২ অক্টোবর উত্তরায় শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। ১৭ অক্টোবর আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। সংঘর্ষ, যানজট ও কারখানার কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, সরকার আগেই নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে এবং মালিকপক্ষও তাতে সম্মতি জানিয়েছে। আইন অনুযায়ী মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দুই মালিক সংগঠনই মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনার পর বোর্ড গঠনের উদ্যোগেও তারা সম্মতি দিয়েছে। এ অবস্থায় আন্দোলন অব্যাহত থাকার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক হলেও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ (জি-ফপ)। সংগঠনটির আহ্বায়ক মির্জা আল শামীম আমার দেশকে বলেন, উত্তরার সাম্প্রতিক ঘটনাকে তিনি সাধারণ শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখছেন না। তাঁর অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা ও দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন। কিছু শ্রমিককে জোর করে কারখানা থেকে বের করে আন্দোলনে নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
মির্জা আল শামীমের দাবি, আন্দোলনের সময় পুলিশের ওপর হামলা, মারধর এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উত্তরার আন্দোলনে বামপন্থি সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন শিল্প মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কয়েকজন নেতা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি মন্টু ঘোষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অস্থিরতায় বন্ধ হয়েছিল ছয় কারখানা
শ্রমিক আন্দোলন ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার মধ্যে ছয়টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারখানাগুলো হলো ওলিও অ্যাপারেলস, ভার্সেটাইল অ্যাপারেল, এমব্রেলা, ডেজলিং ড্রেসেস, নাইস অ্যাপারেল ও ভার্সেটাইল ফ্যাশন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কিছু শ্রমিক অন্যদের কাজে বাধা দিয়ে এবং কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। তাঁদের দাবি, শ্রমিকদের কাজে ফেরার অনুরোধ জানানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এ অবস্থায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে বিজিএমইএর একাধিক সূত্রের বরাতে আমার দেশ জানিয়েছে, বন্ধ ঘোষণার দুই দিন পর কারখানাগুলোতে আবারও পুরোদমে উৎপাদন শুরু হয়।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি
বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে উত্তরায় শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, বর্তমান মজুরিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শফিকুল ইসলাম নামের এক শ্রমিক বর্তমান আয়ে সংসার চালানোর অসুবিধার কথা জানান। রিমন নামের আরেক শ্রমিক বলেন, বেতন না বাড়ানো পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তবে একবারে বড় অঙ্কের মজুরি বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের আশঙ্কা, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো আর্থিক চাপে পড়তে পারে। এতে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এ অবস্থায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও জরুরি।
শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে সরকার ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় সরকার ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের বাইরে থেকে অর্থ দিয়ে এবং দেশের ভেতরের একটি পক্ষের সহযোগিতায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুই পক্ষের সমন্বিত তৎপরতা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের দুরবস্থা ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি যথাযথভাবে মোকাবিলা না করে সরকার বিরোধী দলকে দায়ী করছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, শ্রমিকদের দাবি পূরণে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ এখন গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে আয় বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে আলোচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং শ্রমিক-মালিকের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




