পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে টানা নয় মাস পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে খুলছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। ২০২৬-২৭ পর্যটন মৌসুমে দ্বীপটিতে প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক যেতে পারবেন। এ জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ১৫ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাতায়াত করতে পারবেন। এ সময়ে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক গমনবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানের সময়সীমা, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা এবং পর্যটকবাহী জাহাজ ছাড়ার স্থান পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নতুন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিদ্যমান নির্দেশনা বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্বীপের ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর পর্যটনের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মতামতের ভিত্তিতে পর্যটন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে।
২০২৬-২৭ পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানের সময়সীমা, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা এবং জাহাজ ছাড়ার স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।
রাতযাপনে আগের নিয়ম বহাল
মন্ত্রণালয়ের নতুন অফিস আদেশে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের অন্যান্য নির্দেশনা বহাল রাখা হয়েছে। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন। একই দিন তাঁদের ফিরে আসতে হবে। এ মাসে দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ নেই।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পর্যটকেরা দ্বীপে রাতযাপন করতে পারবেন। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকবে।
আগের প্রজ্ঞাপনে প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার অনুমতি থাকলেও নতুন অফিস আদেশে এ সংখ্যা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে।
সেন্টমার্টিনে রাতযাপনের বিষয়ে নতুন আদেশে আলাদা করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপন করা যাবে। সে অনুযায়ী নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে।
দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি
নতুন অফিস আদেশ অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ২৬ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বিধি ২৬-এ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমীক্ষা, গবেষণা ও অনুসন্ধানের বিষয়ে অধিদপ্তরের অনুমতি এবং নির্ধারিত ফি প্রদানের বিধান রয়েছে। বিশেষ করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনুসন্ধান, সমীক্ষা বা গবেষণার ক্ষেত্রে অধিদপ্তর নির্ধারিত ফি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মানতে হবে পরিবেশ সংরক্ষণের নির্দেশনা
গত ১২ অক্টোবরের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম পর্যটকদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে ভ্রমণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড সংবলিত টিকিট কিনতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণে দেওয়া নির্দেশনাও অনুসরণ করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের পলিথিন বহন না করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা এবং নিজেদের পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
সভায় আরও জানানো হয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবালসহ সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো বহাল থাকবে। রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চশব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি করা যাবে না।
এ ছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সৈকতে মোটরসাইকেলসহ অনুরূপ যানবাহন চালানো নিষিদ্ধ থাকবে। এসব বিধিনিষেধ মেনে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পর্যটকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।




