নতুন জামালপুর ডেস্ক:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন কয়েকটি নির্দেশনার মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর, প্রবন্ধ, ব্যাখ্যা ও গবেষণার খসড়া। এতে সময় বাঁচছে এবং শেখার সুযোগ বাড়ছে। তবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তা, যুক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতার বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু সঠিক উত্তর দেওয়া নয়; বরং বিষয়বস্তু বোঝা, তথ্য যাচাই করা, যুক্তি তৈরি করা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। এআই এসব দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে নিজের চেষ্টা ছাড়া তৈরি করা উত্তর সরাসরি অ্যাসাইনমেন্টে ব্যবহার করলে প্রকৃত শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আর সেই উত্তরের পেছনের যুক্তি বুঝতে পারা এক বিষয় নয়। শিক্ষার্থী যদি এআইয়ের সহায়তায় ভালো মানের লেখা তৈরি করেও নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাহলে তার প্রকৃত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং ব্যবহারের ধরনই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের দেওয়া তথ্যও সব সময় নির্ভুল হয় না। অনেক সময় ভুল তথ্য ও দুর্বল যুক্তি বিশ্বাসযোগ্য ভাষায় উপস্থাপিত হতে পারে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের তথ্যের উৎস যাচাই, একাধিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এদিকে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা ও নম্বরকেন্দ্রিক মূল্যায়নব্যবস্থা এআইয়ের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াতে পারে। শুধু লিখিত পরীক্ষার ফলাফল বা অ্যাসাইনমেন্টের মান বিবেচনা না করে শিক্ষার্থী বিষয়টি কতটা বুঝেছে, নিজের যুক্তি তুলে ধরতে পারছে কি না এবং বাস্তব সমস্যায় অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারছে কি না, তা মূল্যায়ন করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষা, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা ও প্রকল্পভিত্তিক কাজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কোন কাজে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যাবে, কোথায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত এবং প্রযুক্তির সহায়তা নিলে তা কীভাবে উল্লেখ করতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার।
বাংলাদেশে সব শিক্ষার্থীর কাছে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা সমানভাবে নেই। ফলে এআইভিত্তিক শিক্ষার সুযোগও সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এ ব্যবধান কমাতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও কপিরাইট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে শিক্ষকের ভূমিকা কমে যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। শিক্ষার্থীর ভুল যুক্তি শনাক্ত করা, নৈতিকতা শেখানো এবং প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এআইকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে—প্রথমে নিজে কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা, প্রয়োজনে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া, প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করা এবং সবশেষে নিজের উপলব্ধি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। এতে প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও বজায় থাকবে।
ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট হবে না; বরং সঠিক প্রশ্ন করা, ভুল শনাক্ত করা, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এআই এসব দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীর হয়ে শেখার দায়িত্ব পালন করতে পারে না।
সবশেষে, এআই কত ভালো উত্তর তৈরি করতে পারে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার্থী সেই উত্তর কতটা বুঝতে, যাচাই করতে ও বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছে। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীর সহকারী হতে পারে, কিন্তু চিন্তার বিকল্প নয়। কারণ, নিখুঁত উত্তর তৈরির চেয়ে উত্তরকে বিচার করার সক্ষমতাই একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে তোলে।
এআইয়ের যুগে শিক্ষার্থী: উত্তর বাড়ছে, চিন্তা কমছে
React:




