Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জাতীয়

জামালপুরের ইতিকথা-১৩: নীলের নীল বিষে জামালপুরের কৃষকের বিদ্রোহ

জামালপুরের ইতিকথা-১৩: নীলের নীল বিষে জামালপুরের কৃষকের বিদ্রোহ

ব্রহ্মপুত্রের তীর তখনও আজকের মতো শহরের ইট-পাথরে বন্দি হয়নি। চারদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ, ধানের শিষ, পাট, আখ আর কৃষকের ঘামে ভেজা মাটি। সেই মাটির বুকেই একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল নীলের নীল রং। দূর থেকে নীল ফুলের সৌন্দর্য দেখা গেলেও কৃষকের কাছে সেই নীল ছিল ঋণের ফাঁস, জোরজবরদস্তি আর সর্বস্বান্ত হওয়ার প্রতীক।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো জামালপুরের কৃষিজীবনেও নীলচাষের চাপ তৈরি হয়। ইউরোপীয় নীলকররা কৃষকদের কাছ থেকে জমি নিয়ে কিংবা দাদনের মাধ্যমে নীল চাষে যুক্ত করত। অগ্রিম টাকা দেওয়া হতো কিন্তু সেই টাকা ছিল স্বস্তির নয়, বরং কৃষকের জন্য এক ধরনের ঋণের শিকল। নির্ধারিত দামে নীল দিতে হতো। ভালো ফলন হলেও কৃষকের লাভ থাকত সামান্য; ফলন খারাপ হলে দায় আরও বাড়ত।

যে জমিতে কৃষক ধান ফলাতেন, পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, সেই উর্বর জমিতেই নীল চাষের জন্য চাপ দেওয়া হতো। নীল গাছ মাটির ওপর শুধু একটি ফসল ছিল না, কৃষকের জীবনযাত্রার ওপরও তার প্রভাব পড়ত। খাদ্যশস্যের জমি কমে যেত, ঋণ বাড়ত, আর নীলকরদের সঙ্গে বিরোধ ক্রমে তীব্র হয়ে উঠত। এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও একদিনে তৈরি হয়নি। উনিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকেই ময়মনসিংহ অঞ্চলে নীলচাষ নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে সম্মিলিত প্রতিরোধের মনোভাব। নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনী, দাদনের চাপ কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব কোনোটিকেই আর আগের মতো নীরবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না অনেকে।

জামালপুরের গ্রামীণ সমাজে প্রতিরোধের একটি বিশেষ চিত্রের কথাও স্থানীয়দের স্মৃতি ও বর্ণনায় পাওয়া যায়। নীলকরদের লোকজন কিংবা পুলিশের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের মানুষ সংকেতের মাধ্যমে একত্র হতেন। গাছ বা উঁচু জায়গায় উঠে ঘণ্টা বাজানো কিংবা বিশেষ সংকেত দেওয়ার মাধ্যমে আশপাশের মানুষকে সতর্ক করা হতো এমন বর্ণনা স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় উঠে এসেছে। মুহূর্তের মধ্যে বহু কৃষক লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। এটি ছিল এক ধরনের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা, যেখানে খবর পৌঁছাতে কোনো চিঠি, টেলিগ্রাম কিংবা সরকারি বার্তার প্রয়োজন হতো না। একটি সংকেতই যথেষ্ট ছিল।

নীলকরদের সঙ্গে কৃষকদের এই সংঘাত ক্রমে আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। কোথাও নীল চাষে অস্বীকৃতি, কোথাও নীলকুঠির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, কোথাও লাঠিয়ালদের প্রতিরোধ সব মিলিয়ে বাংলার গ্রামীণ সমাজে তৈরি হতে থাকে বিস্ফোরক পরিস্থিতি।

জামালপুরের মাদারগঞ্জের গুণারীতল ইউনিয়নের কাতলামারী ও আশপাশের এলাকাতেও নীলচাষের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। কাতলামারীতে নীলকুঠি স্থাপনের ইতিহাসের উল্লেখ স্থানীয় ঐতিহ্যচর্চায় পাওয়া যায় উনিশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে সেখানে নীলকুঠির অস্তিত্বের কথা বলা হয়। আজ সেই স্থাপনার অধিকাংশই দৃশ্যমান নয়। কিন্তু স্থাননাম, স্থানীয় স্মৃতি ও বিচ্ছিন্ন নিদর্শন যেন সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

এরপর আসে ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ।

বিদ্রোহের প্রধান বিস্ফোরণ ঘটে নদীয়া ও যশোরসহ বাংলার বিভিন্ন নীলচাষ অঞ্চলে। কৃষকরা দলবদ্ধভাবে ঘোষণা করতে থাকেন তারা আর নীল চাষ করবেন না। এই আন্দোলন দ্রুত বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলেও এর অভিঘাত পৌঁছায়। জামালপুরের কৃষকরাও নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে যুক্ত হন এমন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও স্থানীয় স্মৃতি পাওয়া যায়।

এই বিদ্রোহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রামের সংঘর্ষ ছিল না। কৃষকেরা বুঝেছিলেন, একা প্রতিরোধ করলে নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনী ও প্রশাসনিক প্রভাবের সামনে টিকে থাকা কঠিন। তাই গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে সম্মিলিত অস্বীকৃতি।

নীলচাষের বিরুদ্ধে কৃষকদের এই অবস্থান ব্রিটিশ প্রশাসনকেও পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ১৮৬০ সালে গঠিত হয় নীল কমিশন। কমিশনের তদন্তে নীলচাষিদের ওপর জবরদস্তির অভিযোগ গুরুত্ব পায়। কমিশনের প্রতিবেদনের পর নীলচাষে কৃষকদের ওপর জোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট হয়।

নীল বিদ্রোহের ফলে বাংলার নীলশিল্পের ভিতও নড়ে যায়। অনেক নীলকুঠি পরিত্যক্ত হয়, অনেক কুঠির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কৃষকের জমিতে নীলের জায়গা ধীরে ধীরে ফিরে পেতে থাকে খাদ্যশস্য।

তবে জামালপুরের ইতিহাসে নীলবিদ্রোহকে শুধু একটি ফসলের বিরুদ্ধে কৃষকের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এই অঞ্চলের কৃষকসমাজ এর আগেও নানা ধরনের শোষণ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। পাগলপন্থী আন্দোলন, পরবর্তী কৃষক-প্রজা আন্দোলনসহ নানা গণপ্রতিরোধের ধারায় দেখা যায় জামালপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামীণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার নিজস্ব ঐতিহ্য তৈরি করেছিল।

নীল ছিল সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ মাদারগঞ্জের কোনো মাঠে দাঁড়ালে হয়তো নীলকুঠির চিমনি দেখা যাবে না। কাতলামারীর কোনো পথে হাঁটলেও শোনা যাবে না নীলকরদের ঘোড়ার শব্দ। সেই লাঠিয়াল বাহিনী নেই, নেই দাদনের খাতা। কিন্তু মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। একসময় এই মাটির কৃষককে বলা হয়েছিল ধান নয়, নীল ফলাও। কৃষক শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন এই জমি আমার, ফসলও আমার সিদ্ধান্তে হবে। সেই অস্বীকৃতিই একদিন বাংলার নীল বিদ্রোহের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। আর জামালপুরের মাটি সেই দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসে রেখে গেছে নিজের একটি নীরব, অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies