বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, স্লোগানে দেশের কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে দলটি। বিএনপি নেতারা নিজেদের সন্তান, ভাগনে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রীকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর, প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমির বলেন, দেশকে কোনো সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হবে না। তরুণরা জেগে উঠেছে। পূর্ণ মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা থামবে না। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে আরও শক্তিশালীভাবে কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় আদায়ে দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি সরকার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করলেও জামায়াত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে না। জনগণের অধিকার ও প্রত্যাশা পূরণে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, তাঁরা সরকারের পতন চাননি, বরং সরকার সফল হোক, সেটিই প্রত্যাশা করেছিলেন। কারণ সরকারের সফলতা মানে দেশের সফলতা। এত দিন সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বললেও এখন থেকে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবেন তাঁরা।
বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে বিএনপি সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে সরকারের যোগ্যতারও ঘাটতি রয়েছে।
বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত বিএনপি তাঁদের মতোই একটি রাজনৈতিক দল ছিল। এরপর দলটি রাতারাতি নিজেদের অতীত ভুলে গেছে। জুলাই সনদের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও গণভোটের প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে তাঁদের কোনো ভিন্নমত ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে ছিল জামায়াত, যাতে গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়। কিন্তু বিএনপি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর মতে, এ ঘটনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা হয়েছে। আগের স্বৈরাচারী সরকার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও সেই পথ অনুসরণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল নীরব থাকতে পারে না।
জামায়াতের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, নানা কারসাজি ও অনিয়মের পরও জনগণ তাঁদের যে আসন দিয়েছে, সেই আসনে নির্বাচিত ৮৯ জন সংসদ সদস্য দেশের ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে কাজ করবেন। জনগণের স্বার্থ রক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
বিরোধী দলকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, জামায়াত কোনো লোভ-লালসার কাছে নতি স্বীকার করেনি। জাতির সঙ্গে কেউ প্রতারণা করলে লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দল দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে নতুন করে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি এবি পার্টির আহ্বান
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত হয়ে গেছে। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, আমরা তা কল্পনাও করিনি।’
তিনি বলেন, বিএনপি নিজেরাই দাবি করেছে, জুলাইয়ে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।
মজিবুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি ভোগ করেছেন। বিএনপিরও একই ভুল করা উচিত হবে না।
জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সামঞ্জস্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে। এর অনেক কিছুই বিএনপির ৩১ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এমন আচরণ করছে, যেন জুলাই সনদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব: অলি আহমদ
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের মাধ্যমে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।
গণভোটের রায় উপেক্ষা করলে সংকট বাড়বে: মামুনুল হক
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র মেরামতের একটি রূপরেখা। রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল।
বিএনপির বিরুদ্ধে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে দ্বৈত অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার গঠনের ফলাফল মেনে নিলেও গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জুলাই সনদ কার্যকর করতেই হবে; অন্যথায় সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংকট আরও গভীর হবে।’
জুলাই সনদ নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে বিএনপি: হাসনাত আব্দুল্লাহ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেন, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য। তাঁর মতে, জুলাই সনদ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠার মতো।
হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, সরকার রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদের মৌলিক চেতনাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।




